_'ভালো হচ্ছে না কিন্তু ছাড়ুন বলছি, ছাড়ুন।' _'এত সহজে না।' একথা বলে শীতলের হাত ধরে টানতে টানতে ইয়াসির বাইরে বেরিয়ে এলো। সকালের ঠান্ডা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে। মাথার উপর স্বচ্ছ সুনীল আকাশ। দু'একটা কাক হেঁড়ে গলায় ডাকতে ডাকতে উড়ে যাচ্ছে নিজের গন্তব্যে। এখান থেকে কয়েক মিনিট হাঁটলে দেখা মিলবে একটি নদী। শান্ত নদী ছোটো ছোটো স্রোতে বয়ে নিয়ে চলেছে নিজস্ব নিয়মে। সম্ভবত এটা মেঘনা নদীরই শাখা। তবে জায়গাটা একেবারেই সুনশান। এখান থেকে লোকালয় আরো অনেক দূরে। ইয়াসির শীতলের হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। এবং শীতলের হাতটা ছেড়ে দিয়ে পেছনে ঘুরে মুচকি হাসল। ছাড়তে দেখে শীতল এবার বিষ্ময় নিয়ে তাকালে ইয়াসির বলল, -'আচ্ছা আমি ভিতুর মতো পালাচ্ছি কেন? ভয় পায় নাকি ওই শুদ্ধকে? মোটেও না! তাহলে শুধু শুধু পালানোর মানেটা কি? উফ! বুঝলে বাবুই তোমার বোকা হওয়ার রোগটা বোধহয় আমার উপরে ভর করেছে। তা নাহলে আমি ইয়াসির খান এমন করার তো কথা না।' -'শুদ্ধ ভাই? কই শুদ্ধ ভাই?' ব্যাকুল সুরে কথাটা বলে শীতল এদিক-ওদিক তাকাল। খুঁজতে লাগল অনেক আশা নিয়ে। কান্নাভেজা কন্ঠে ডাকতেই লাগল করুন সুরে। ওর এই ব্যাকুলতা সহ্য হলো না ইয়াসিরের। সে শীতলকে নিয়ে ফিরে যেতে যেতে বলল, -'চলো ভেতরে গিয়ে অপেক্ষা করি? দেখি কখন আসে তোমার শুদ্ধ ভাই? আর আমিও রেডি হই তাকে স্পেশালভাবে স্বাগত জানানোর জন্য।' ইয়াসিরকে পাল্টি খেতে দেখে শীতল বাকহারা হয়ে তাকিয়ে রইল শুধু। ভয়ংকর কোনো পরিকল্পনা করছে সেটাও বুঝতে বাকি রইল না। ভয়ে দুরুদুরু বুকে আল্লাহকে ডাকতে লাগল সে। এতক্ষণ গাড়ি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে ইয়াসিরকে বের হতে না দেখে সেখানে বুরাকও উপস্থিত হলো। জলদি বের হওয়ার তাগাদা দিলো। কিন্তু ইয়াসির গোঁ ধরে রইল সে কোথাও যাবে না। লুকোচুরি খেলা নয় এবার যা হবে সামনাসামনি। এমন পরিস্থিতিতে ইয়াসিরের কথা শুনে বুরাক এক কোণে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল। টেনশনে দরদর করে ঘামছে সে। খুব ভালো করে বুঝতে পারছে তার জীবনের অন্তিম মুহূর্ত চলে এসেছে। পালাতে গেলে ইয়াসির তাকে শুঁট করবে; না পালালে শুদ্ধর হাতে মরতে হবে। মনে মনে এসব ভেবে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে সাইকো ইয়াসিরের কান্ডখানায় দেখতে লাগল। এদিকে ইয়াসির শীতলকে সোফায় বসিয়ে খাবার এনে মুখোমুখি বসল। টেনশনে চুপসে যাওয়া শীতলের দিকে খাবার এগিয়ে দিয়ে খেতে ইশারা করল। কিন্তু শীতল মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালে পুনরায় বলল, -'খাও।' -'গলা দিয়ে নামবে না।' -'পানি দিয়ে গিলো, তবুও খাও।' -'বলছি তো খাব না।' -'খাবে,,খেতে হবেই।' একপর্যায়ে ইয়াসিরের জোরাজুরিতে বাধ্য হয়ে শীতল মুখে খাবার নিল, তারপর কান্নাভেজা সুরে বলল, -'ছেড়ে দিন না আমাদের? কি ক্ষতি করেছি আমরা? কেন আমাদের পেছনে পড়েছেন আপনি? ' -'আমার ব্যাপারে এতকিছু জানলে কিভাবে?' -'(.....)' -'কিছু জিজ্ঞাসা করছি? মুখ খোলো বাবুই। আমি তোমাকে ব্যাড টাচ্ করতে চাই না। আমার কাছে অহেতুক জেদ করে নিজের সর্বনাশ ডেকে এনো না।' শীতল বুঝল মুখ না খুলে উপায় নেই তাই বলল, -'স্বর্ণ আপু আপনার ব্যাপারে অনেক কিছু জানে। সেগুলো নোট করে ফাইলে রেখেছিল। ফাইলটা একবার ধরতে গেলে আপু বারণ করেছিল। বারণ করা কাজ করতে ভালো লাগে আমার। কি এমন আছে যে ধরতে বারণ করল সেটা দেখতেই চুপিচুপি ফাইলটা নিয়ে পড়েছি। আর সায়ন ভাইয়া একদিন রেগে আপনাকে গালি দিচ্ছিল আপুকে 'অগ্নিকন্যা' নামে ডাকায়। সেটা শুনেছি। সেই ফাইলে আপনার আবছা ছবিও ছিল সেটা দেখে রেস্টুরেন্টে প্রথমে চিনতে পারি নি তবে পরে চিনতে পেরে আপুর ভয়ে আর কিছু বলি নি। কারণ আপু তখন মারাত্মক রেগেছিল।' -'তারমানে তোমার বোন আমাকে চিনতে পেরেছিল সেদিন?' -'হুম। পাবলিক প্লেসে সিনক্রিয়েট করবে না ভেবেই মূলত চুপ ছিল।' -' আচ্ছা বাবুই, এখন যদি শুদ্ধ আসে চলে যাবে আমাকে ফেলে?' -'হুম।' -' খারাপ লাগবে না?' -'না, কারণ আপনি আমাকে মেরেছেন। যারা আমাকে মারে, বকে তারা আমার শত্রু। শত্রুর কাছে থাকার ইচ্ছে নেই আমার।' -'আমি আদরও করতে পারি। করে দেখাই?' -' (...)' -'ধরো শুদ্ধ এখানে এলো এসে তোমার সামনে দাঁড়াল। দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মারা গেল। আমি শুঁট ফুঁট কিছুই করলাম না তাও মারা গেল। তখন পথ ক্লিয়ার তবুও তুমি আমার হবে না, বাবুই? একটু ভেবে বলো তো? কেন জানি তোমার সাথে জোরাজুরি করতে ইচ্ছে করে না আমার। যদি করত তাহলে বসে থাকার অবস্থাতেই রাখতাম না তোমায়। জীবনে এই প্রথম কোনো মেয়ের সঙ্গে ভালো করে কথা বলার চেষ্টা করছি। তোমার জেদের কারণে তবুও মার খেলে। জেদ করে বড় বড় বুলি না আওড়ালে মার টা খেতে না পাখি।' একথা বলে ইয়াসির প্রায়ই জোর করে ইয়াসির শীতলকে খাওয়াল। খুব কাঁদল তবুও একপ্রকার খাইয়েই ছাড়ল। খাওয়ানোর পর ফিচেল হেসে বলল, -'আপন জনের মৃত্যুতে কাঁদার জন্য হলেও শরীরে এনার্জি থাকা জরুরি। একটু খেলে এবার দেখবে মন ভরে কাঁদতে পারবে।' একথা বলে ইয়াসির হাত ধুয়ে এসে বুরাককে বলল কী কী করতে হবে। সেই অনুযায়ী বুরাক কাজ করতে লাগল। এদিকে এঞ্জেলিকার দেখানো মানুষটা ভুল ছিল। একজন যুবক তার গর্ভবতী বউকে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছিল হাসপাতালের দিকে। দূর থেকে এঞ্জেলিকা সেই কাঙ্খিত মানুষ ভেবেছিল। কিন্তু যখন দেখল ভুল তখন আবার উড়তে লাগল। সংকেত পেয়ে হন্ন হয়ে খুঁজতে লাগল ডানা ঝাপটিয়ে ঝাপটিয়ে।
এদিকে চলন্ত গাড়িতে বসা শুদ্ধর ফোনে তখন আচমকা লোকেশন শো করল। অবাক হলেও আর অপেক্ষা করার সময় নেই। তখন ইয়াসিরের সিক্রেট ডোনে কাছেই ছিল তারা। এবার গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে খুব দ্রুত সেখানে পৌঁছাল। বাকি বন্ধুদের এ্যালার্ট করল হাসান। শুদ্ধ গাড়ি থেকে নেমে এগোতে এগোতে কোমরে গুঁজে রাখা পিস্তলটা হাতে নিতে ভুলল না। এটাতে সাইলেন্সার লাগানো এবং তার নিজের নামে লাইলেন্স করা। তার ক্ষিপ্ত হাঁটার গতি আর থমথমে মুখ দেখে রাগের মাত্রা বুঝতে কষ্ট হলো না হাসানের। কিছু বললে যে হিতে বিপরীতও হবে তাও খুব ভালো করেই জানে সে। তবুও শুদ্ধর হাতটা টেনে ধরে থামাল। তারপর আমতা আমতা করে বলল, -'ভাই থাম। এত হাইপার হোস না, আমাদের মাথায় রাখতে হবে শীতল এখনো ওদের কাছে। একটা ভুল শীতলের বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না।' -'(....)' -' যা করার সাবধানে করতে হবে আমাদের। মনে রাখতে হবে তীরে এসে তরী ডুবানো যাবে না।' শুদ্ধ থমথমে মুখে চোয়াল শক্ত করে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঢুকল বাড়িটার ভেতরে। কারো পায়ের পদধ্বনি শুনে ইয়াসির মুচকি হাসল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল হাত-মুখ বেঁধে মেঝেতে ফেলা রাখা শীতলের দিকে। শুদ্ধ পৌঁছে গেছে তার লোকরাও তাকে জানিয়েছে। তবুও ওর চোখে মুখে আতঙ্কের লেশ মাত্র নেই। শুধু একবার বুরাকের দিকে তাকালে বুরাক হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়াল। অর্থাৎ তার আদেশ মোতাবেক কাজ সম্পূর্ণ করা হয়েছে। ঠিক তখনই সেখানে শুদ্ধ উপস্থিত হলো। গেট পেরিয়ে গটগটিয়ে ঢুকল। শীতল এক বুক আশা নিয়ে এতক্ষণ দরজার দিকেই তাকিয়ে ছিল। তার বিশুদ্ধ পুরুষকে দেখে কান্নার বাঁধ ভাঙল। ইচ্ছে করল দৌড়ে গিয়ে বুকে লুকিয়ে পড়তে। কিন্তু সেটা সম্ভব হলো না তাই অশ্রুভেজা চোখেতাকিয়ে রইল শুদ্ধর দিকে। হাত-মুখ বাঁধা শীতলকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে শুদ্ধর বুকে যেন ঢস নামল। সে এগোতেই শীতল বারবার মাথা নাড়াতে লাগল। গোঁ গোঁ শব্দ করে কাছে যেতে বারণ করল। হঠাৎ এমন করাতে শুদ্ধ কিছু একটা আন্দাজ করে শান্ত চাহনিতে তাকাল ইয়াসিরের দিকে। টিগার চেপে পিস্তল তাক করতেই ইয়াসিরই বলল, -'কিরে থামলি কেন? বুকে পাঁটা থাকলে প্রাণ নিয়ে ফিরে যা।' -'ফিরব তো অবশ্যই তবে তোর হিসাব বরাবর করি।' শুদ্ধ রক্তচক্ষূ নিয়ে তাকালে ইয়াসির দুই হাতে হাততালি দিয়ে হঠাৎ হো হো হাসল। শুদ্ধকে উস্কে দিতে আরো কিছু বলল। শুদ্ধ পুনরায় এগোতে গেলে শীতলের ছটফটানি বেড়ে গেল। অঝর ধারায় কাঁদতে কাঁদতে সে অনবরত মাথা নাড়াতে লাগল। শুদ্ধ শুনল না বরং শীতলের কাছে যেতে এগোতেই হাসান খেয়াল করল শুদ্ধর পায়ের কাছে কারেন্টের তার পড়ে আছে। বিনাকারণে তার ফেলে রাখবে কেন? এমন না যে কোনো কাজ চলছে। তার সন্দেহ হলে একটু এগিয়ে দেখল সত্যি সত্যি ওটা কারেন্টের তার। হতে পারে এটা ইয়াসিরের আরেকটা চাল। হতে পারে তার দিয়েই কোনো ফাঁদ পেতেছে। হাসানের ধারণা তখন সত্যি প্রমাণ হলো বুরাকের দিকে তাকিয়ে। ওই ছেলেটাও তাকিয়ে আছে শুদ্ধর পায়ের দিকে, শুদ্ধ কখন তারে পা পাড়িয়ে যাবে আর কারেন্টের শক খাবে। এমন শক যে বাপ ডাকারও সময় পাবে না। অতঃপর শীতলের চোখের সামনে মরবে শীতলের বিশুদ্ধ পুরুষ।
এদিকে চারদিকে ফজরের আজান দিচ্ছে। শুদ্ধ আর হাসান জেট থেকে নেমে হেঁটে যাচ্ছিল চা বাগানের দিকে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে পুরনো চা বাগান আছে। লোকেশন আপাতত সেদিকেই শো করছে। হঠাৎ ট্র্যাক করা লোকশন আর শো ই করছে না। রিং যেখানে থাকবে লোকেশনটাও সেখানেই স্থির। কিন্তু গোল চিহ্নের লাল দাগ দেখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ রিং এর জিপিএস কেউ ডিসকানেক্ট করে দিয়েছে। ফোনের দিকে তাকিয়েই হাঁটতে হাঁটতে শুদ্ধ এবার থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তার হার্টবিট যেন থমকে গেছে। শীতল জান থাকতে কখনোই রিং খুলবে না। তাহলে কি ধরা পড়ে গেল? নাকি ইয়াসির ধরে ধরেছে? তা নাহলে লোকেশন শো করছে না কেন? শুদ্ধকে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে যেতে দেখে হাসান ওর কাঁধে হাত রেখে বলল, -' কি রে চল?' শুদ্ধ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হাতে থাকা ফোনের দিকে। তবে কি সব শেষ? তার মুখ দেখে হাসানের ভ্রুঁজোড়া কুঁচকে গেল। সে শুদ্ধর নজর অনুসরণ করে ফোনে উঁকি মারতেই দেখে লোকেশন শো করছে না। সে হতবাক হয়ে কিছু বলার আগে শুদ্ধ আকাশের দিকে তাকাল। চারদিকে তখনো ঘুটঘুটে গাঢ় অন্ধকার। দূরে কোনোমসজিদ থেকে আজান ভেসে আসছে। শুদ্ধর জানে না আজ তার কি হলো! বুকের ভেতরটা এ করছে কেন। মনটাই বা কু-ডাকছে কেন। চোখ বন্ধ করলেই শীতলের ব্যথাতুর, কান্নারত মুখখানা চোখের পাতায় ভাসছে কেন। সে শুকনো ঢোক গিলে পুনরায় আশপাশে তাকাল। তারপর জোরে জোরে শ্বাস টেনে বুকের বাঁ পাশে হাত রাখল। এখন অবধি কোনো পরিস্থিতি তাকে কাবু করে পারে নি। সে সর্বদা শান্ত, নিশ্চল। কিন্তু এখন কেন জানি অজানা একটা ভয়ে মনটা বড্ডব্যাকুল হয়ে উঠেছে। সে কিছু ভেবে আকাশের দিকে তাকাল। তারপর থেমে থেমে শুধু এইটুকু উচ্চারণ করল, -'ইয়া আল্লাহ্, হয় ওকে সহি সালামতে পাইয়ে দাও নয়তো আমার মৃত্যুও এখানেই লিখে রেখো।' একথা শুনে হাসান ছলছল চোখে তাকাল শুদ্ধর দিকে তারপর শুদ্ধর কাঁধে হাত রেখে বলল, -'কিচ্ছু হবে না বন্ধু, আল্লাহ ভরসা।' শুদ্ধ নিশ্চুপ। পরপর ক'বার ঢোক গিলে পুনরায় তাকাল ফোনের দিকে। না, কোনোভাবেই কাজ হচ্ছে না। ওদিকে অর্ক, কামরান নজর রাখছিল ল্যাবে বসেই। কিন্তু লোকেশন শো না করায় তারাও অনবরত ফোনকল দিতে থাকল শুদ্ধকে। তারা সঙ্গে না এলেও বুঝেছে এখন শুদ্ধের মনের অবস্থা। কিন্তু শুদ্ধ কল রিসিভ করল না দেখে ওরা কল করল হাসানকে। হাসান কল রিসিভ করে জানাল সত্যি সত্যি লোকেশন ট্রেস করা যাচ্ছে না। একথা শুনে সবার চিন্তা বেড়ে গেল। হঠাৎ শুদ্ধ ভোরের আকাশের দিকে তাকিয়ে মুখের কাছে হাত রেখে উচ্চশব্দে ডেকে উঠল,' হেল্প মি এঞ্জেলিকা! প্লিজ হেল্প!' পরপর তিনবার ডাকতেই হঠাৎ'ই “কুঁ….কুঁকুঁ…" স্বরে সাড়া দিলো সাদা ধবধবে একটা পায়রা। পুরো শরীরই সাদা। এক কথায় চমৎকার তার রুপ! শুদ্ধর ডাক শুনেই চিলের মতো দূর আকাশ থেকে তাকে নিচে নেমে আসতে দেখা গেল। নিজের মালিক ডাকমাত্রই সাড়া দিতে পেরে সে খুশিতে পাখা ঝাপটাতে-ঝাপটাতে একের পর এক ডিগবাজি মারতে মারতে উড়ে এলে বসল শুদ্ধর বাড়িয়ে দেওয়া হাতের উপর। তারপর অনবরত ডাকতে থাকল, “কুঁ… কুঁকুঁ…।"
শুদ্ধ তার মাথায় হাত বুলালে সে তালুতে মাথা রাখল। অর্থাৎ তার আরো আদর চায়। কিন্তু এখন হাতে একদমই সময় নেই। তাই শুদ্ধ তার মাথায় চুমু এঁকে ফোন থেকে শীতলের সুস্পষ্ট ছবি দেখাতেই এঞ্জেলিকা হঠাৎ ফুড়ুৎ করে উড়ে চলে গেল। উড়তে উড়তে একবার পেছনে ঘুরে তাকাল শুদ্ধর দিকে। তারপর ডান দুটো ঝাপটে ধীরে ধীরে আরো উপরে উড়তে লাগল। একটুপরেই শুদ্ধর ফোনে পরপর নোটিফিকেশন আসতেই বুঝল এঞ্জেলিকার কাছে থাকা ড্রোনে সব দেখা যাচ্ছে।ফজরের আজান পরও অন্ধকার থাকায় আকাশ থেকে নিচের তেমন কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। শুদ্ধ হাসানের দিকে তাকাতেই হাসান সম্মতি সূচক মাথা নাড়িয়ে হাসল কেবল। কারণ এঞ্জেলিকা থাকলে শুদ্ধ ঠিক পাবে শীতলের খোঁজ। আর মালিকের মতোই জেদি এঞ্জেলিকা শীতলের খোঁজ না নিয়ে ফিরবে না। নোটিফিকেশন যখন আসছেই দাঁড়ানোর সময় নেই তাই তারাও দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। জেট থেকে নেমেই স্যান্ডি গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছিল তাদের। ততক্ষণে সকালের নরম আলো ফুটতে শুরু করেছে। এঞ্জেলিকার ড্রোনে দেখা যাচ্ছে সে কোনদিকে যাচ্ছে। যেতে যেতে দেখা গেল পুরনো এক বিল্ডিংয়ের উপরেই চক্রাকারে ঘুরছে। শুদ্ধ জুম করে দেখল কেউ একজন কাউকে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছে ওই বিল্ডিংয়ের ভেতর। এঞ্জেলিকাও দূর আকাশ থেকে মাটির দিকে ধীরে ধীরে নামছে। তারমানে সে নিশ্চয়ই শীতলকে দেখেছে! _____
-'প্রয়োজনে শুদ্ধকে মেরে দেবো তবুও তোমাকে আমি ছাড়ছি না বাবুই পাখি। একদমই ছাড়ছি না!' একথা শুনে শীতলের হাসির বেগ যেন দ্বিগুন বাড়াল। সে হাসতে হাসতে জবাব দিলো, -'আমি ততক্ষণ পর্যন্ত বোকা যতক্ষণ আমার আপনজনরা সুস্থ, নয়তো আমি কিন্তু চৌধুরীদেরই রক্ত! কি যেন বললেন, আমার বিশুদ্ধ পুরুষকে মারবেন? মারা তো দূর, শুধু হাত বাড়িয়ে দেখুন হাতটা হাতের জায়গায় রাখি কী না!' -'বয়স কত তোমার? সিক্সটিন, সেভেনটিন অর এইটটিন?' -'বয়স যতই হোক ফিডার খাওয়ার বয়স অন্তত পেরিয়ে এসেছি।' -'আমার তোতাপাখি এত কথা বলে জানতাম না তো?' -'প্যারা নিয়েন না ফিরে যাওয়ার আগে আরো অনেক কিছু জানবেন।' -'ফিরতে দিলে তো।' -'আমি ফিরবোই! বাবা-মায়ের চিন্তা আমি করি না কারণ আমার বোন সব সামলে নেবে। কিন্তু ওই যে একজন মুডি পুরুষ আছে না? তার জন্য হলেও আমাকে ফিরতে হবে।' -'জানো আমার একটা বন্ধু ছিল। তাকে আমি খুব বিশ্বাস করতাম। খুব ভালোবাসতাম। সেও আমাকে ভীষণ ভালোবাসত। একদিন করল কী; আমাকে ডেকে হুমকি দিলো তাকে আমার ব্যবসার শেয়ার দিতে হবে। নয়তো সে নাকি সব ফাঁস করে দেবে। আমিও রাজি হয়ে তাকে বাসায় ডাকলাম। দু'জন ব্রান্ডের ওয়াইন পান করে ঘুমিয়ে গেলাম। তারপর কী হলো জানো বাবুই? সকালবেলা আমি ঘুম থেকে উঠলাম ঠিকই কিন্তু সে আর উঠলই না। কত করে ডাকলাম আমার ডাক শুনলোই না। প্রশান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছে ভেবে আমিও বিরক্ত না করে চলে গেলাম সুদূর নিউইয়র্ক। এক সপ্তাহ পর ফিরে দেখি সে তার বাড়ি চলে গেছে। টানা চারদিন নাকি মরার মতো ঘুমিয়েছে। ঘুমানোই স্বাভাবিক ওয়াইনের সাথে সেদিন কড়া ডোজের ঘুমের মেডিসিন মিশিয়েছিলাম কী না! হয়তো সেও বুঝেছিল। এরপর খবর এলো আমার গোপন কিছু ডিলের কথা পুলিশকে জানিয়ে দিয়েছে। বন্ধুরা দুষ্টুমি করবে স্বাভাবিক তাই না? দুষ্টামি ভেবে মাফ করে দিলাম। এরপর দেখি আবার আমার কাজে বাঁধা হচ্ছে সে, পরে ভুলিয়ে ভালিয়ে আমার ডেরায় আনলাম। কত সুন্দর করে বোঝালাম এসব না করতে। কিন্তু সে আমার কথা শুনলোই না। পরে যত্ন করে তাকে বালির মধ্যে গলা অবধি বালিতে পুঁতে শিরোচ্ছেদ করলাম। চমৎকার হয়েছিল ওর শিরোচ্ছেদ করা। শিরোচ্ছেদ কি বুঝো তো বাবুই?' -'হুম।' -'বলো তো কি?' -'মাথা কেটে ফেলা।' -'আরে বাহ্, তুমি তো দেখি খুব ইন্টেলিজেন্ট গার্ল।' -'কিন্তু এই ঘটনা আমাকে কেন শোনালেন? আমরা তো কেউ আপনার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় নি। বরং আপনিই শুরু থেকে আমাদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। চৌধুরী বাড়ির অশান্তির কারণ হয়েছেন।তাহলে আমাদের উচিত না আপনার নিয়ম অনুযায়ী আপনাকেও বালিতে পুঁতে শিরোচ্ছেদ করা?' -'ভদ্র মেয়েরা এভাবে কথা বলে না বাবুই এবার কিন্তু রাগ হচ্ছে আমার।' -'রাগ হচ্ছে? ওমা কেন? আচ্ছা রাগ কমানোর মলম আবিষ্কার হয়েছে? হয় নি, তাই না? আপনি নাকি সায়েন্টিস্ট একটা আবিষ্কার করে ফেলুন না, সমশের ভাই? সাধারণ জনগণের অনেক উপকার হবে কিন্তু। ধরেন, কেউ রেগে গেল ফট করে তার বাড়ির লোক রাগের মলম তার কপালে লাগিয়ে দিলো, ব্যস রাগ চলে গেল। কি দারুণ ব্যাপার তাই না?' -' আমি কোনো সায়েন্টিস্ট না বাবুই আমি মাফিয়া। মাফিয়া কাকে বলে জানো?' -'জানি তো। এটাও জানি আপনি স্মাগলিং, অস্ত্র ব্যবসা, মানি লন্ডারিং এর কাজ করেন। বাংলাদেশে আপনার কয়েকটা সিক্রেট ডেনও আছে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, সেসব জায়গার একটা জায়গায় আমরা এখন আছি।' -'ওহ লাভলি! ব্রাভো বাবুই, ব্রাভো! আর কি জানো আমার ব্যাপারে?' -'আর? আর..আর ওহ হ্যাঁ মনে পড়েছে আপনার প্রিয় খাবার নারীদেহ। সুন্দরী নারী খুব যত্ন করে খান আপনি। দোয়া করি, আপনার সঙ্গী যেন ঠিক আপনার মতোই হয়। সেও যেন হাজার জনের বিছানা ঘুরে এসে আপনার সঙ্গের সঙ্গী হতে পারে।' ইয়াসির হাসল। তবে হাসতে হাসতে শক্ত হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে এমন একটা থাপ্পড় দিলো শীতলের ঠোঁটের সাথে দাঁত লেগে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এলো। আচমকা আক্রমণে প্রতিরোধ করার সময়টুকুও পেল না শীতল। তবে নোনতা ভাব অনুভব করে বুঝল ঠোঁট কেটেছে, জিহবাটাও কেটেছে। সে কাটা ঠোঁট চেপে ধরে হাসল। আবার প্রমাণ হলো পৃথিবীতে হাজার হাজার সুদর্শন পুরুষ থাকলেও শুদ্ধর মতো কেউই হতে পারবে না। কেউ তার অহেতুক বকবক শুনবে না। রাগও দেখবে না। অভিমানও বুঝবে না। যেমন ইয়াসির তাকে এখানে আনার পর থেকেই কত আদুরে সুরে কথা বলে যাচ্ছিল। ডাকের কী বাহার! বা..বাবুই! কিন্তু একপর্যায়ে হাল ছেড়ে তো ঠিকই তাকে রক্তাক্ত করল। এক নিমিষেই আদর শেষ। তবে তাকে দূর্বল ভেবে কাজটা করলেও শীতলও যে চৌধুরীদের জাত এটা ভুললে চলবে না। সে ওড়নায় দিয়ে রক্ত মুছে বলল, -' মারলেন কেন?' -'ইচ্ছে হলো তাই।' -'ইচ্ছে হলে মারতে হবে? আমি আমার বাবার হালাল কামাই খেয়ে বড় হয়েছি আপনার মতো মাফিয়ার হারাম টাকা নয়। তাহলে আপনি কেন রক্তাক্ত করলেন?' একথা বলে শীতল তড়িৎ কাঁটা চামচ তুলে ইয়াসির হাতে গেঁথে দেওয়ার আগে ইয়াসির খপ করে হাতটা ধরে নিলো। বিদ্যুৎ গতিতে ওর পুরুষালি শক্তপোক্ত শরীর দিয়ে শীতলকে পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরল। শীতলের আর ক্ষমতা নেই নিজেকে ছুঁটানোর। এখন নড়তেও অক্ষম সে। তার এই হাল দেখে ইয়াসির শব্দ করে হেসে উঠল। এইটুকু একটা বাচ্চা সে কি না তাকে আক্রমণ করতে আসছে, ভাবা যায়! ব্যাপারটা তার কাছে মজাই লাগল। তারপর সে একহাতের মুঠোয় শীতলেন দুহাত চেপে আরেকটা হাত দিয়ে শীতলের মুখের সামনে আসা চুলগুলো সরাল। লম্বা বিনুনিটা নেড়ে চেড়ে দেখল। এরপর বিনুনির আগা ধরে সেটা সাপের মতো করে টেনে এনে শীতলের গালে ঠেঁকিয়ে মুখ বলল, 'ফুঁস!' একাজ করে নিজে হো হো করে হেসে শীতলের মসৃন কাঁধে খোঁচা খোঁচা দাঁড়িওয়ালা থুতনি ঠেঁকাল। এই পিচ্চির রাগও আছে? সে তো আলাভোলা ভেবেছিল। তবে মানতেই হয় এই মেয়েও চালাক, প্রচুর চালাক। সে আসলে বোকা সেজে থাকে। একথা ভেবে সে শীতলের রক্তাক্ত ঠোঁটে দৃষ্টি ফেলে বলল, -'কোথায় লেগেছে, দেখি?' শীতল নিজেকে ছাড়ানোর বৃর্থা চেষ্টা করে রাগে হিসহিসিয়ে জবাব দিলো, -'ছাড়ুন। অসভ্যের মতো জড়াজড়ি না করে দূরে সরে ভদ্রভাবে কথা বলুন। অসহ্য লাগছে কিন্তু আমার। ছাড়তে বলেছি!' -'অসভ্য মানুষ অসভ্যতামি করবে এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?' শীতল জবাব দিলো না ঘৃণার দৃষ্টি ছুঁড়ে অন্যদিকে তাকাল। রাগে শরীর রি রি করছে তার। এত সুদর্শন হয়ে কী লাভ যদি পারসোনালিটি ফিরো লেভেল পার করে! তখন ইয়াসির তার রক্তাক্ত ফোলা ঠোঁটে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, -'রাগ করলে সোনা? আচ্ছা সরি আর মারব না। বাড়ি যাবে? চলো দিয়ে আসি?' একথা শুনে শীতলের ছটফটানি থেমে গেল, সে এবার অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল। ইয়াসিরের হাসি-হাসি মুখ দেখে বোঝার চেষ্টা করল সত্যি নাকি মজা। তাকে এভাবে তাকাতে দেখে ইয়াসির এবার নিষ্পাপ মুখে বলল, -'আমি ভ্যাম্পায়ার নই তবুও রক্তের তৃষ্ণা পাচ্ছে, কি করে বলো তো?' -' এখন কি আমার হাত কেটে আপনাকে রক্ত গেলাতে বলছেন?' -'উহুম, সেসব কিছু করতে হবে না। শুধু একটা কাজ করবে তাহলেই বাড়ি যেতে পারবে, করবে?' -'হেয়ালি না করে বলুন নয়তো ছাড়ুন। আপনার পারফিউমের গন্ধে গা গুলাচ্ছে আমার।' -'আমি একপ্রকার জানোয়ার হলেও আমার রুচি সর্বদা হাই লেভেলের স্নো হোয়াইট। আমার পোশাক থেকে শুরু করে সব ব্রান্ডের। আর আমি জানি আমার পারফিউমের সুগন্ধে তোমার পাগল পাগল লাগছে তাই একথা বলছো।' -'পাগল-পাগল না ছাঁই। আপনার পারফিউমের থেকে শুদ্ধ ভাইয়েরটা আরো বেশি জোশ। একদম খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। আসছে,,'আমার সবকিছু ব্যান্ডের।' শেষের কথাটা তাচ্ছিল্য করে টেনে বলতেই ইয়াসির হাতের বাঁধন এতটা শক্ত করল যে শীতল ছটফটিয়ে উঠল। তবুও ইয়াসির ছাড়ল না। যখন কেঁদে ফেলল তখন ঠান্ডা সুরে বলল, -' কেউ আমাকে ছোটো করতে চাইলে আমি তাকে জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে ফেলি। যেন পরবর্তীতে একাজ করার সুযোগ না পায়। কিন্তু তুমি এসে অবধি বারবার এটাই করছো। আমার কিন্তু পছন্দ হচ্ছে না বাবুই পাখি। একদমই পছন্দ হচ্ছে না। আমাকে রাগিও না, রাগের ফল আমার জন্য তৃপ্তিদায়ক হলেও তোমার জন্য হবে না।' শীতল এবার আর টু শব্দও করল না। কারণ সে ইয়াসিরের কথার মানে বুঝেছে। তাকে চুপ হতে দেখে ইয়াসির বলল, -' যাবে বাড়ি? গেলে বিনিময়ে শুধু একটা কাজ করে দেখাও।' শীতল মুখে জবাব দিলো না তবে চোখ তুলে তাকাল। তখন ইয়াসির আরেকটু গা ঘেঁষে কানে কানে ফিসফিস করে বলল, -'বিনাবাঁধায় তোমার ঠোঁটের স্বাদ নিতে দাও। প্রমিস, ছেড়ে দেবো। ' একথা বলতে না বলতেই ইয়াসিরের হাতের ঘড়িটা পিক পিক শব্দ করে উঠল। সে ভ্রুঁ কুঁচকে আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে না পেয়ে সন্দেহের দৃষ্টি ছুঁড়ল শীতলের দিকে। ইয়াসির শীতলকে চেপে ধরলে শব্দটা যেন আরো জোরালো হচ্ছে। সে শীতলকে ছেড়ে দু'পা পিছিয়ে আপাদমস্তক নজর বুলিয়ে বলল, -'তোমার কাছে কি লুকিয়ে রেখেছ বের করো বলছি। বাবুই রাগিও না আমাকে, তোমাকে বারবার আঘাত করতে খারাপ লাগবে আমার।' শীতল তার কথা বুঝলেও গোঁ বেচারা মুখ করে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজে নিজের দিকে তাকিয়ে বলল, -'খালি হাত-পা নিয়ে আপনিই তো আমাকে তুলে নিয়ে এসেছেন। আমি আবার কি লুকিয়ে রাখব? যাই হোক, আপনি কি আমার চোর বলতে চাচ্ছেন?' ইয়াসির শীতলের কথার ফাঁদে পা দিলো না বরং ভূতগ্রস্তের মতো তার হাতটা টেনে শরীর চেক করতে লাগল। শীতল বাঁধা দিতে গেলেও শুনল না। একপর্যায়ে ইয়াসির কামিজে হাত দিতে গেলে হাতের ঘড়িটা আবার শব্দ করতে লাগল। ইয়াসির এবার তাকিয়ে দেখল হাতের রিং যতবার তার ঘড়িতে লাগছে ততবারই তার ঘড়িটা শব্দ করতে উঠেছে। সে রিং খুলতে গেলে শীতল কিছুতেই খুলতে দেবে না। এবার কেঁদে ফেলল সে। কত আকুতি-মিনুতি করল তবুও ইয়াসির ছাড়ল না। রিং খুলে চেক করে দেখে তার সন্দেহই সঠিক। রিং এ Gps কানেক্টে করা। তারমানে এখানে থাকা ঠিক হবে না। ধারণা মতে, এতক্ষণ কেউ তাদের লোকেশন ট্র্যাক করে ফেলেছে। সে এবার রাগের বশে শীতলকে আরেকটা থাপ্পড় মেরে হিসহিসিয়ে বলল, -'কি ভেবেছিলি আমাকে ফাঁকি দিবি? পরে দেখছি তোকে আগে এখান থেকে বের হই।' একথা বলে শীতলের হাত ধরে টানতে টানতে তাকে বাইরে নিয়ে গেল। যেতে যেতে এতক্ষণ লুকানো ফোনটা বের করে তার সহকারীকে বলল নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য। গাড়ি করে ইয়াসির এবার শীতলকে নিয়ে গেল আরেকটা ডেরায়। সেখান থেকে পাড়ি দেবে দেশের বাইরে।
___" অনেক বলে ফেলছো রুপোলী, তুমি আমি আমরা কেউ কিছু জানি না, না জেনে মেয়ে কে এভাবে কষ্ট দিও না।
আদিবা তালুকদার চুপ করে আসে, রুপোলী বেগমের কথায় মিম কান্না বন্ধ করে শান্ত হয়ে দেখছে, রুপোলী বেগম কে, রুপোলী বেগম রাবেয়া তালুকদার কে বলে উঠলেন,
___" ভাবী আর কী জানবো, আমাদের কথা না ভেবে বিয়ে করেছে, আমাদের থেকে সবকিছু লুকিয়ে রাখলো, প্রথম থেকে জেদি ছিলো, কিছু বলিনাই, আদরে আদরে বড় করেছি একটাই মেয়ে আমাদের, ওর কারণে আজকে ওর বাবা অসুস্থ হয়েছে, আমরা তো কখনো কেনো কিছুর কমতি রাখিনি, তাহলে এত বড় একটা কথা লুকিয়ে রাখলো কেনো, হানিফের জন্য তো ওকে আন্টি পড়িয়ে দিয়ে গেছে, এখন আমি তাঁদের সামনে কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াবো বলবেন?
রুপোলী বেগমের কথায় তিশা বলে উঠলো,
___" কাকি তুমি কিছুই জানো না, মিম কিভাবে বিয়ে টা করেছে, তুমি আগে সবটা শুনো তারপরে....
তিশার কথায় রুপোলী বেগম আরো রেগে গেলো,
___" তুমি চুপ করো, তুমিও জানো সব ?
তিশা রুপোলী বেগমের ধমকে মাথা নিচু করে নিলো, মিম নিজের মায়ের কথায় তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,
___" তোমার কথা শুনে কেমন লাগছে জানো,আমি তোমার নিজের মেয়ে না, আমার মনে হয় তুমি আমার আগের কথা গুলো ভুলে গেছো,আমি তো কাউকেই বিয়ে করতে রাজি ছিলাম না, এখনো নেই আমি জাস্ট ....
___" কারণ তোমার সঙ্গে আরশের বিয়ে অনেক আগেই হয়ে গেছিলো তাইতো ?
মিমের মুখের কথা কেরে নিয়ে আদিবা তালুকদার গম্ভীর গলায় বলল কথাগুলো, মিম নিজের ফুপুর মুখে এমন প্রশ্ন শুনে এতক্ষণ ধরে রাখা কান্না দমিয়ে রাখতে না পেয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো, আদিবা তালুকদার যে মিম কে অবিশ্বাস করছে এটা আদিবা তালুকদারের কথায় বুঝা যাচ্ছে, মিম নিজেকে এক্সপ্লেইন না করে রুপোলী বেগমের দিকে চেয়ে কান্নাভরা কন্ঠে বলে উঠলো,
___" আমি জানি আমি ভালো মেয়ে না, কারণ ভালো মেয়েরা তো সত্যি কে লুকিয়ে রাখে না, ভালো মেয়েরা তো কলঙ্কিত হয় না, ভালো মেয়েরা তো সবসময় বাবা-মা আত্মীয়-স্বজনের কথা বাদ্য মেয়ের মতো শুনে, আমি খারাপ না তো কী, যার সঙ্গে বিয়ে ঠিক তাঁর ছোট ভাই কে বিয়ে করেছি, তোমাদের চোখে বিয়েটা কিভাবে হয়েছে এটা ফ্যাট না, বিয়ে করেছি এটা ফ্যাট, আমি এই অপবাদ নিয়ে ভালো আছি নাকি নেই, এটা জানা লাগবে না, তোমাদের কাছে আমি অপরাধ করেছি এটা আগে, আচ্ছা আম্মু তোমার মেয়ে ভালো আছে? একবারও জানতে চেয়েছিলে?
মিমের কথায় রুপোলী বেগম নীরব চোখে মিম কে দেখতে লাগলো, মিম চোখের পানি মুছে তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,
___" আমাকে নিয়ে তোমাকে সমাজের কটুক্ষ শুনতে হবে না, কেউ যদি তোমার মেয়ের কথা জানতে চায় তাকে বলে দিয়ো, তোমার মেয়ে মা-রা গেছে, আমার মুখ তোমাকে কখনো আর দেখতে হবে না, আমার কথা কখনো মনে করে কেঁদো না, তোমার মেয়ের জেদ বেশি, সে আর তোমাকে কষ্ট দিবে না, না তাঁর জন্য তোমাকে মানুষের কথা শুনতে হবে।
রুপোলী বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে মিমের দিকে, আদিবা তালুকদার অবাক হয়ে বলে উঠলো,
___" এসব কথার মানে কী মিম ?
মিম হেঁসে উঠে বলল,
___" ফুপি আমি একা থাকতে চাই, আজকে তোমাদের উপর দিয়ে অনেক কিছু গেছে, এর মধ্যে আমিও একজন, শুধু আজকের রাত টা আমাকে সহ্য করো, আমার মুখ আর তোমাদের দেখতে হবে না, প্লিজ আগের মতো এখন একা ছাড়ো।
মিমের বারবার এমন কথায় তিশা আদিবা তালুকদার অবাক হয়ে দেখছে মিম কে, রুপোলী বেগম এবার বেশ রাগী গলায় বললেন,
___" আমাদের সঙ্গে নাটক করছো, তোমার আর আরশের বিয়ে টা কিভাবে হয়েছে আমি জানতে চাই?
মিম রুপোলী বেগমের কথায় উওর না করে তিশা কে ছেড়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পরলো, রুপোলী বেগম মেয়ের গা ছাড়া ভাব দেখে আরো রেগে গেলেন, বিকাল বেলা আদিবা তালুকদার মিমের বাবা কে ফোন সবকিছু বলেন, মিমের বিয়ের খবর শুনে ভদ্র লোক অসুস্থ হয়ে পড়েছে, রুপোলী বেগম মেয়ের কথা শুনে মিমের বাবা কে সঙ্গে তালুকদার বাড়িতে আসার জন্য রেডি হয়ে যায়, মিম শহরে চলে আসার পর থেকে তিশার নিত্যদিনের কাজ হয়ে গেছে, মিমের বাড়ির উঠানে ফুলগাছ গুলোর যত্ন নেওয়া, এটা মিমের আদেশ, তিশা প্রতিদিনের মতো আজকে বিকালে মিমদের বাড়িতে এসেছিলো, এসেই রুপোলী বেগম আর মিমের বাবা কে রেডি হতে দেখে তিশা জানতে চাইলে তিশা কে শুধু বলে,
___" মিম আরশ কে বিয়ে করেছে, তুমি প্রথম থেকে জানতে সব?
তিশা রুপোলী বেগমের কথা শুনে আমতা আমতা করে, কারণ মিম তিশা কে সবকিছু ফোনে বলছে আগেই, কিন্তু রুপোলী বেগম কিভাবে জানতে পারলো এটা ভেবেই তিশা ঢোক গিলল, তিশা কে আমতা আমতা করতে দেখে রুপোলী বেগম যা বুঝার বুঝতে পেয়েছে, তিশা কে আর কিছু না বলে তালুকদার বাড়িতে আসার জন্য পুনরায় রেডি হতে লাগে, তিশা রুপোলী বেগমের তারাহুরা দেখে জেদ ধরে তিশা আসবে তালুকদার বাড়িতে, রুপোলী বেগম সরাসরি নাকচ করে দেয়, কিন্তু তিশা পিছু ছাড়ে না, রুপোলী বেগম বাধ্য হয়ে তিশা কে নিয়ে আসতে রাজি হয়ে যায়, রুপোলী বেগম তালুকদার বাড়িতে এসেই মিমের রুমে আসো, আর মিমের বাবা নিচে আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদারের সঙ্গে বসে আছে, রুপোলী বেগম মিম কে রাগী গলায় পুনরায় কিছু বলতে নিবে, তাঁর আগেই আরাত মিমের রুমে ঢুকে যায়, আরাত একপলক নিজের মা আদিবা তালুকদার কে দেখে, তিনি আরাত কে দেখে মুখ অন্য দিকে ঘুরায়, রুপোলী বেগম আরাত কে দেখে বেকুব বনে যায়, কারণ মিমের মতো আরাতের চোখমুখ কান্না করে ফুলে আছে, রুপোলী বেগম বুঝে উঠতে পারলেন না, আরাত কেনো কান্না করছে, পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে কেনো, শুধু কী মিম আরশ কে ঘিরে নাকি আরো কিছু ঘটেছে, রুপোলী বেগম বেশি মাথা ঘামালেন না, আরাত রুপোলী বেগম কে বলে উঠলো,
আরাত একটু সময় নিয়ে মলিন মুখে বলতে শুরু করলো, সবকিছু শুনার পর রুপোলী বেগমের মন বেশি ক্ষিপ্ত হলো মিমের উপর, কারণ ওইদিন ক্লাস রুমে কী হয়েছিল এটা মিম আরশ ছাড়া কেউ জানে না, আর আরাত যতটুকু দেখেছে,আর তাঁদের বিয়ের পর কী কী হয়েছে সেসব বলছে, রুপোলী বেগম মিমের দিকে চেয়ে আছেন, কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না, উনাদের ধারনা মিম আর আরশ ক্লাসে নোংরামি করছিলো, আর সবাই দেখতে পেয়ে তাঁদের বিয়ে দিয়ে দিছে, রুপোলী বেগম নিস্তব্ধ চোখমুখ নিয়ে রুম থেকে ধীর পায়ে বের হয়ে গেলো, রাবেয়া তালুকদার রুপোলী বেগমের সঙ্গে রুম থেকে বের হয়ে গেলো, আদিবা তালুকদার মিমের পাশে এসে দাঁড়ালো, কিছু বলতে নিবে মিম আদিবা তালুকদারের উপস্থিত বুঝতে পেয়ে মুখে মেকি হাসি টেনে বলল,
___" আর মাএ একটা রাত ফুপি, তাহলে আর তোমাদের এই কলঙ্কিত মেয়েকে দেখতে হবে না।
মিমের কথায় আদিবা তালুকদার মিমের মাথায় হাত রেখে বলল,
___" আমি জানি আমার মিম এমন না, অভিমান করছিস মা, তোর ফুপি আজকে নিজের মধ্যে নেই, একটার পর একটা শকট মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে রে মা, তোরা অনেক বড় হয়ে গেছিস।
মিমের বন্ধ চোখের কোণ থেকে পানি গড়িয়ে পরলো, নিজের মাথায় আদিবা তালুকদারের হাতের উপর হাত রেখে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলল,
___" তুমি এতক্ষণে আসলো কেনো ফুপি, আমার যে তোমাকে খুব প্রয়োজন ছিলো, তুমিও সবার মতো আমাকে ভুল বুঝেছো বলো, দেখো না আম্মু আমার সঙ্গে কিভাবে কথা বলছে, একবারও আমাকে নিজের বুকে জরিয়ে ধরে বললো না, তুই কেমন আসিস মা, তোর কী বেশি কষ্ট হচ্ছিল, তুই ভুল না আমি জানি, আম্মু একবারও বলল না, তুমি আমার একটিবারও খোঁজ নিতে আসলে না, আমি সত্যি খুব খারাপ মেয়ে তাইনা ?
আদিবা তালুকদার মিমের কথা শুনে কান্না করে দিলেন, তিশা আরাত কান্না করছে, আদিবা তালুকদার মিমের মাথার কাছে বসে বলল,
___" তুই আমার সোনা মা, তুই খারাপ না, আজকে আমাদের পরিস্থিতি এমন জায়গায় নিয়ে এসেছে, সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে, কোথায় থেকে কি ঘটে যাচ্ছে, সবকিছু এলোমেলো লাগছে, তুই চিন্তা করিস না, আমি আসি তো, আমরা সবাই মিলে বসবো, তুই যদি আরশের সঙ্গে সংসার করতে চাস আমরা তোকে ধুমধামে নতুন করে আনুষ্ঠানিক ভাবে তুলে দিবো।
মিম আরশের নাম শুনে মুখে মেকি হাসি টেনে বলল,
___" আমার সাথে যেটা ঘটেছে সেটা আমার নসিবে ছিলো তবে ঘটনা সূচনা করার মানুষ টার কর্মফল খুব কঠিন ভাবে পেতে হবে।
আদিবা পুনরায় বুঝলেন না মিমের কথায় মানে, আইরা মিমের রুমে দরজার সামনে এসে একনজর মিম আরাত তিশা কে লক্ষ করে আদিবা তালুকদার কে বললেন,
___" মামনী... বড়-মামনী তোমাকে নিচে ডাকছে, হানিফ ভাইয়া আর তাঁর মা-বাবা এসেছে!
আইরার কথায় আদিবা তালুকদার অবাক হয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন, মিম চোখ মেলে তাকালো আইরার কথা শুনে, আইরা রুমে ঢুকে বিছানার সাইটে বসলো, আরাত তিশা বিছানায় বসে আছে, সবার মুখ মলিন, একদিনে কতকিছু ঘটে গেলো, রশ্মি বাড়ি থেকে চলে গেলো, আরাত আর মাহিরের রিলেশন কথা সবাই জেনে গেলো, মিম আরশের বিয়ে সবার সামনে প্রকাশ পেলো, একদিনে এতকিছু হজম করতে পারছে না কেউ, তারউপর নতুন করে হানিফ আর তাঁর মা-বাবা উপস্থিত হয়েছে তালুকদার বাড়িতে,
চলমান....
সামনে পর্বে তাসিনের জন্য শাস্তি স্বরূপ চমক আছে, আজকের পর্ব ছোট হয়ে গেলো, আগামী পর্ব ইনশাল্লাহ বড় করে দেওয়ার চেষ্টা করবো, গল্প ভালো-খারাপ দুইটাই বলবে
সবাই শুধু দেখছে তাসিন কে, কারো মনে তাসিনের জন্য একটু মায়া হলো না, হবে কী করে, তাসিনের এই পাগলামি দেখতে দেখতে সবাই বিরক্ত, প্রায় তিন বছরের বেশি হবে তাসিনের এই পাগলামো গুলো সহ্য করে আসতেছে, তাসিনের সঙ্গে আরশের ফ্রেন্ডশিপ টা ভিন্ন ছিলো, তানিস প্রথম থেকেই প্যান্ট শার্ট পড়ে অভ্যস্ত, ছেলেদের মতো তাঁর চলেফিরা চালচলন, আরশের সঙ্গে মাঝেমধ্যে আরশ দের বাড়িতে আসতো, শুধু আরশ দের বাড়িতে না রাফি মাহির দের বাড়িতে যেত, কিন্তু আরশের বাড়িতে বেশি আসার কারণ ছিলো হানিফ, হানিফ কে প্রথম দেখায় ভালো লেগে যায়, হানিফের নীরবতা মা-বাবার বাধ্য ছেলে, সবসময় চুপচাপ স্বাভাব সবকিছু তাসিনের ভালো লেগে যায়, আরশের মা প্রথম থেকে তাসিন কে পছন্দ করতেন না, কারণ একটাই ছেলেদের মতো চলাফেরা চালচলন পোষাক, উনার কথা মেয়েরা সবসময় শান্তশিষ্ট ভদ্র পোষাকে নমনীয় থাকবে, আরশ কে মাঝেমধ্যে বকাঝকা করতেন তাসিনের সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ করার জন্য, আরশ কর্ণপাত করতো না মায়ের কথা, তাসিন আরশ দের বাড়িতে এসে হানিফের সামনে এসে এটাওটা করে নিজের অনুভূতি বুঝাতে শুরু করে, কিন্তু হানিফ নিজের মায়ের মতো তাসিন কে পছন্দ করতো না, হানিফ তাসিন কে পছন্দ করে না জানার পড়ে তাসিনের পাগলামো শুরু হয়ে গেলো, হুটহাট হানিফ কে রাস্তা ঘাটে বিরক্ত করতে লাগলো, এতে আরশ থেকে শুরু করে আরশের বাবা-মা হানিফ সবাই বিরক্ত সঙ্গে অধিষ্ঠিত হতে লাগে, শেষ পর্যন্ত আরশ নিজে তাসিনের বাবা-মা কে বলে সবকিছু, কিন্তু তাঁদের কথা তাসিন যা চাইবে তাই করবে, বাবামায়ের কথা শুনে তাসিন আরো বেশি আস্কারা পেয়ে যায়, শেষমেশ আরশের মা তাসিন কে অপমান করে, আরশ দের বাড়িতে আসতে বারণ করে দেয়, উনার কথা তাসিন কে কখনো নিজের ঘরে তুলবে না, দিনদিনে তাসিনের পাগলামো তে হানিফ দুর্বল হয়ে যায়, তাসিন কে বলে দেয় তুমি নিজেকে চেঞ্জ করো, তোমার চলাফেরা লাইফ স্টাইল সবকিছু চেঞ্জ করতে পারলে আমি তোমাকে ভালোবাসবো, এতে তাসিন ধরে নেয় হানিফ তাঁকে ভালোবাসে, হানিফ তাঁর হয়ে গেছে,
হানিফ কে তাসিনের প্রতি দুর্বল হতে দেখে আরশের বাবা-মা বড় ছেলের জন্য মেয়ে দেখতে শুরু করে, শহরে মেয়ে উনার পছন্দ না, ভদ্র মহিলার পছন্দ মেয়ে ধার্মিক সাধারণত সঙ্গে নম্রভদ্র, আর দূরে গ্রামে বিয়ে করাবে যেন তাসিন কেনো ভেজাল করতে না পারে, মিমের ছবি দেখে উনাদের পছন্দ হয়ে যায়, এজন্য হানিফ কে সঙ্গে নিয়ে একদম মিম কে দেখতে চলে যায়, হানিফ যেতে চাইছিলো না মেয়ে দেখতে, তাসিন কে ভালো লাগতোনা শুরু করেছিলো, তারপর তাসিন কে কথা দিয়েছিল, তাসিন নিজেকে চেঞ্জ করতে পারলে হানিফ তাসিন কে ভালোবাসবে, এদিকে মা-বাবার মুখের উপর না করতে পারছিলো না,বাধ্য ছেলে মতো মা-বাবার সঙ্গে মেয়ে দেখতে চলো গেলো গ্রামে, কিন্তু বিয়ে ভাঙ্গার সব দায়িত্ব ছোট ভাই কে দিলো, গ্রামে এসে মিম কে দেখে কেনো ফিলিংস কাজ করে নি, দুজন কে যখন আলেদা কথা বলার জন্য ছাঁদে পাঠানো হলো, মিমের চুপচাপ নিরবতা আর মিমের ভনিতা ছাড়া বিয়ে করবে না বলা কথাতে হানিফ অবাক হলো, মুখের উপর এভাবে রিজেক্ট করে দেওয়াতে মিমের বিষয়ে জানতে ইচ্ছা হলো, তাইতো মিম কেনো বিয়ে করবে না, বা কেমন ছেলে পছন্দ, সবকিছু জানতে চাইলো মিমের কাছে, বাড়িতে ফিরে আরশ কে বলে দেয় তুমি মা-বাবা কে ম্যানেজ কর আমি এই মেয়ে কে বিয়ে করবো না, তাসিনের প্রতি নিজের অনুভূতি, সবকিছু আরশ কে বলে এবং বিয়ে ক্যানসেল হয় তাঁর জন্য বাবা-মা কে রাজি করাতে, কিন্তু কয়েকদিন পড়ে যখন বাবামায়ের চাপে হানিফ মিমের সঙ্গে দেখা করতে যায়, তখন থেকে আরশ কে লক্ষ করে,হানিফ কে মিমের পাশে আরশ সহ্য করতে পারে না, রেস্টুরেন্টে মিম সবকিছু খুলে বলে, আরশের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছে, আর আরশ মিমের সঙ্গে কী কী করেছে, সবকিছু শোনার পর থেকে নিজের ভাইয়ের প্রতি রাগ হয়, হানিফ যদি রাগী ভাইদের মতো হতো তাহলে হয়তো আরশ কে পিটাইতে পিটাইতে ঠিক করে দিতো, একটা মেয়ের সঙ্গে এতটা জঘন্য নিকৃষ্ট কাজ করার জন্য, কিন্তু করতে পারেনি এতি ভদ্র ছেলের কারণে, আরশের চোখে নিজেকে ঘিরে জেলাসি দেখে হানিফ মিমের সঙ্গে কথা বলে, আরশ কে দেখিয়ে দেখিয়ে কথা বলে এবং বুঝায় মিম কে তাঁর পছন্দ হয়েছে, মিম কে সে বিয়ে করবে, এতে আরশ আরো জেলাসি ফিল করে, এদিকে নিজের ভাইয়ের পাশাপাশি তাসিনের প্রতি যতটুকু দুর্বলতা ছিলো তা এক নিমেষেই ঘিন্নাতে পরিনতি হয়ে যায়, তাসিন হানিফের জন্য নিজেকে চেঞ্জ না করে আরো আরেকটা মেয়ের জীবন নষ্ট করতে আরশ কে হেল্প করছে, কথাগুলো ভাবলেই শরীরের রক্ত টকবক করে রাগে, কিন্তু একটাই সমস্যা অতি ভদ্র ছেলে,
আজকে তাসিন আরশের বাড়িতে এসে মিম আরশের বিয়ে কথা বলে দেয়, সঙ্গে মিম কে নষ্ট মেয়ের উপাধি দেয়, যেন আরশের বাবা-মা মিম কে খারাপ মেয়ে ভাবে, আর নিজেদের ভুল ধারণা থেকে তাসিন কে বড় ছেলের বউ করে নেয়, আরশের বাবা-মা প্রথমে তাসিন কে বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই দেননি, কিন্তু তাসিন জোর করে ঢুকে প্রথমে মিম আর আরশের কথা বলে, এতে আরশের বাবা-মা শকট হয়ে হানিফের কাছে জানতে চায়, হানিফ বলে হ্যাঁ আরশ মিমের বিয়ে সত্যি হয়েছে, বড় ছেলের মুখে ছোট ছেলে আর এই বাড়ির হবু বউয়ের কথা শুনে তাজ্জব হয়ে যায়, আরশের মা তাসিনের সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো, তাসিন চোখ ভরা পানি নিয়ে একবার হানিফ তো আরেকবার আরশের বাবা-মার দিকে তাকাচ্ছে, এই আশায় তাড়া তাসিন কে মেনে নিবে, আরশের মা তাসিনের সামনে থেকে সরে এসে আরশের সামনে দাঁড়ালো, আরশ নিজের মায়ের থেকে চোখ লুকালো, আরশ কে চোখ লুকাতে দেখে ভদ্র মহিলা কটাক্ষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে উঠলেন,
___" চোখ লোকাচ্ছ কেনো বাপধন, তুমি তো আমার গর্বিত সন্তান, তুমি একটা মেয়ের সন্মান নিয়ে খেলা করছো, তুমি তাঁকে সবার সামনে অপমান করছো, তাঁকে নিয়ে এখনো খেলে যাচ্ছো বা বা বা বা তোমার মতো ছেলে আমি আমার পেতে ধরে ধন্য বাপধন, খুব ধন্য...
___" আম্মু....
___" ঠাসসস ঠাসসস ঠাসসস ঠাসসস
আরশ ভদ্র মহিলাকে অসহায় গলায় ডাকতেই ভদ্র মহিলা আরশ কে এলোপাতাড়ি গালে থাপ্পড় দিলে লাগলেন, থাপ্পড় দিতে দিতে এক পর্যায়ে আরশের কান্না করতে করতে বললেন,
___" আমি তোমাকে এই শিক্ষা দিয়ে বড় করেছি, একটা মেয়েকে কি করে এই সমাজে কলঙ্ক করতে চেয়েছিলে তুমি, একবারও নিজের মায়ের কথা মনে এলো না তোমার, আমাদের শিক্ষার তুমি এই প্রতিদান দিলে, তুমি কী করে পারলো মিমের সঙ্গে এমন করতে, হ্যাঁ মানলাম সব শেষে বিয়ে করছো, তাহলে মিম কে সম্মান মর্যাদা দিয়ে ঘরে তুললে না কেনো, তুমি যানো একটা মেয়ে কলঙ্ক হওয়ার খেসারত, তুমি বুঝো মেয়েটা একা একা নিজের সঙ্গে কতটা যুদ্ধ করে বেঁচে আছে, এসেছিলো তো আমাদের বাসায়, একবার মনে হয়নি মেয়েটার মনের মধ্যে কী চলছে, মনে হাজারো কষ্ট নিয়ে আমাদের সামনে হাসে খেলে থাকছে, তুমি কী করে পারলে বিয়ে করে তোমার বউ কে রাস্তায় ফেলে আসতে, একটা মেয়ের জন্য কতটা অপমান তুমি বুঝতে পারছো, মেয়েটা নিজের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে এটাই তো অনেক, ছিহ লজ্জা করছে আমার তোমার মতো ছেলেকে পেতে ধরেছি, আমার ভাবতেই শরীর ঘিনঘিন করছে, মিম একা একা কতটা সভার করছে।
ভদ্র মহিলা কান্না করতে করতে কথা গুলো বললো, আরশ নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাপুরষ ভাবছে, তাঁর জন্য তাঁর মা কান্না করছে এর চেয়ে লজ্জা আর কী হতে পারে, আজকে বুঝতে পারছে মিম কে কতটা কষ্ট দিয়েছে, সবার সামনে প্রকাশ না করলো রাতের অন্ধকারে কতটা কান্না করেছে মেয়েটা, একটা মেয়েকে বিয়ে করে রাস্তায় ফেলে আসা মেয়েটার জন্য কতটা অপমান, শুধু সেই মেযেটা বুঝবে, আরশ নিস্তব্ধ হয়ে মেঝের দিকে চেয়ে আছে, মুখে কোনো কথা নেই, চোখটা নিমেষেই লাল টকটকে হয়ে গেছে, আরশের বাবা ভদ্র মহিলাকে শান্ত হতে বললেন, ভদ্র মহিলা হানিফ কে বলল,
___" হানিফ গাড়ি বের করো, আজকেই তালুকদার বাড়িতে যাবো, আমার বউ মাকে আমার বাড়িতে তাঁর প্রাপ্ত মর্যাদা দিয়ে ঘরে তুলবো।
কথাটা বলে ভদ্র মহিলা হানিফের দিকে তাকালো, হানিফ মাথা ঝাকিয়ে বাহিরে যেতে লাগলো, হানিফ কে বাহিরে যেতে দেখে তাসিন হানিফের পিছু নিতে নিলো, আর ভদ্র মহিলা তাসিন এর হাত ধরে আটকে দিয়ে বলল,
___" আমার ছেলের থেকে দূরে থাকো।
তাসিন অসহায় কন্ঠে বলল,
___" আন্টি আমা.......
___" তোমার একটা কথাও শুনতে ইচ্ছুক না আমি।
ভদ্র মহিলা তাসিন এর হাত ছেড়ে দিয়ে একপলক আরশ কে দেখে বাড়ি থেকে হনহন করে বের হয়ে গেলো, আরশের বাবা বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো, আরশ অপরাধী মুখে সোফাতে বসে পরলো, আরশ যানে মিম আসবে না,
★★★
মিম নিজের বিছানায় হাঁটুতে মুখ গুঁজে মলিন মুখে বসে আছে, আদিবা তালুকদার আহাদ তালুকদার কেউ মিমের সঙ্গে টুঁশব্দ পর্যন্ত করে নি, রশ্মিদের বাড়ি থেকে এসে মিম যে বিছানায় বসে পড়ছে তারপর থেকে আর আদিবা তালুকদার বা অন্য কাউকে দেখা যায়নি মিমের রুমে, মিম কান্না করতে করতে চোখের পানি চোখেই শুকিয়ে গেছে, সবকিছু থেকে ছুটে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে, একটা বার আদিবা তালুকদার ভাতিজি কে প্রশ্ন পর্যন্ত করলো না, না কিছু জানতে চাইলো, মিম তাচ্ছিল্য হেঁসে চোখ বন্ধ করে নিলো, গাল গড়িয়ে দুফোঁটা পানি হাতের উপর পরলো, হটাৎই হাতে টান অনুভব হতেই মিম চমকে উঠে চোখ মেলে তাকালো, চোখের সামনে রুপালী বেগমের চেহারা ভেসে উঠতেই মিম রুপোলী বেগম কে জরিয়ে ধরতে নিলে গালে চর পড়লো,
___" ঠাসসসস।
___" কাকি কী করছো।
মিম গালে হাত দিয়ে সামনে তাকাতেই দেখলো রুপোলী বেগমের চোখমুখ রাগে লাল হয়ে আছে, তিশা রুপোলী বেগম কে বাঁধা দিয়ে মিম কে জরিয়ে ধরলো, মিমের চোখে পানি, রুপোলী বেগমের চোখ রাগ থেকে পানিতে পরিনত হয়ে গেছে, রুমের মধ্যে আদিবা তালুকদার রাবেয়া তালুকদার কেও আসতে দেখা গেলো, মিম তিশা কে পেয়ে তিশা কে জরিয়ে ধরলো, রুপোলী বেগম চোখ ভরা পানি আর রাগ নিয়ে বলে উঠলো,
___" তুমি এই কারণে গ্রাম থেকে শহরে এসেছো, একটা বার ভেবে দেখছো গ্রামের মানুষ তোমার এই নষ্টামি জানতে পারলে আমাদের কিভাবে বাঁচতে হবে, মানুষ যদি জানতে পারে, বড় ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছেলের ছোট ভাই কে বিয়ে করেছো, তুমি কেনো এভাবে বিয়ে করছো মিম, আমার জবাব চাই, তোমাকে আমরা কিসের কষ্ট দিয়েছি জার জন্য আমাদের শাস্তি দিচ্ছো তুমি, তোমার আব্বু অসুস্থ হয়ে পড়েছে, শুধু মাএ তোমার কারণে, তোমাকে ইচ্ছা করছে শেষ করে ফেলতে, এইদিন দেখার জন্য তোমাকে বড় করেছি, আগে যদি জানতাম তুমি এমন হবে তোমাকে জন্মের সময় মেরে ফেলতাম।
তাকবীর বিছানায় বসে আরাতের দিকে চেয়ে নিজের রাগ শান্ত করতে ব্যস্ত, আরাত মেঝেতে বসে কিছুক্ষণ পরপর হেঁচকি তুলছে আর তাকবীরের হাতের ক্ষত স্থান ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছে, আরাত ব্যান্ডেজ করে দিতে দিতে তাকবীরের দিকে চেয়ে তাকবীর কে নিজের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে হেঁচকি তুলে বলে উঠলো,
___" আপনার একটুও ব্যাথা হচ্ছে না ?
তাকবীরের সেই চিরচেনা গম্ভীর গলা,
___" না।
ব্যান্ডেজের দিকে চেয়ে আরাত হেঁচকি তুলে পুনরায় বলে উঠলো,
___" এভাবে বাবা-র উপর রেগে কথা বলা আপনার ঠিক হয়নি।
আরাতের কথায় তাকবীর গা ছাড়া ভাব নিয়ে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠলো,
___" উনার ঠিক হয়নি আমার বউয়ের উপর এভাবে ধমক দিয়ে কথা বলা।
তাকবীর কে নিজের মতো করে উওর করতে দেখে আরাত পুনরায় একি ভঙ্গিমায় বলে উঠলো,
___" আপনি নিজেকে কেনো ব্যাথা দিলেন?
আরাতের প্রশ্নে তাকবীর আরাতের দিকে চেয়ে একটা গম্ভীর নিঃশ্বাস ফেললো,কয়েক মুহূর্ত নিষ্পলক আরাতের মুখ পর্যবেক্ষণ করে ব্যান্ডেজ হাতে আরাতের মুখে হাত রাখলো, আরাত নীরব চোখে তাকবীর কে দেখছে, তাকবীর আরাতের মুখের উপরে এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে আরাতের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে আরাতের কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে নীরব কন্ঠে বলে উঠলো,
___" আমার সামনে বা আড়ালে আমার বউকে কেউ বাজে কথা কেনো উচ্চ স্বরে কথা বললে আমি মেনে নিবো না, মানুষ টা যে কেউ হোক, আমার বউ দুষ্টুমি করবে আমি সহ্য করে নিবো, আমার বউ ভুল করবে আমি আমার ভালোবাসা দিয়ে বুঝিয়ে বলবো, আমার বউ অপরাধ করবে আমি তাঁকে শাসন করবো, মানিয়ে নেওয়ার হলে আমি মানিয়ে নিবো, বোঝানোর হইলে আমি আমার সবকিছু দিয়ে বুঝিয়ে বলবো,আমার বউয়ের উপর শুধুই আমার অধিকার, সবসময় একটা কথা মাথায় রাখবে,এখন তুমি আমার বউ, আমার বউ তুমি, এই আজান তালুকদার তাকবীরের অর্ধাঙ্গিনী।
আরাতের চোখে পানি, ঠোঁটের কোণে সুখময় হাসি, মাথা ঝাকিয়ে হুম বুঝিয়ে তাকবীরের হাতে ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ এর উপর এলোপাথাড়ি ঠোঁট ছুঁয়ে দিতে লাগলো, তাকবীর অপলক দেখছে তাঁর পাগল বউয়ের পাগলামি, আরাত ক্ষতস্থানে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে তাকবীর কে দু'হাতে জরিয়ে ধরলো, তাকবীর আরাতের পাগলামি দেখতে দেখতে একপর্যায়ে মুচকি হেঁসে আরাত কে নিজের বুকের মধ্যে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে নিলো, দুজনের মুখে কেনো কথা নেই, চুপচাপ নীরবতায় যেন সুখ খুঁজতে লাগলো দুজন, আরাত শান্ত মেয়ের মতো তাকবীরের বুকে মাথা ঠেকিয়ে আছে, তাকবীর ব্যান্ডেজ হাতেই আরাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, এভাবে কেটে গেলো কয়েক মিনিট,তাকবীর এবার নীরবতা ভেঙ্গে আরাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
___" বন্ধুত্ব আর ভালোবাসা হৃদয় থেকে হয় জোর করে না, আর জীবনে খারাপ সময় আসা দরকার, খারাপ সময় বুঝতে পাওয়া যায়, কে হাত ধরে রাখে আর কে ছেড়ে দেয়, কে পাশে থাকে আর কে হারিয়ে যায়, আমাদের মন অনেক কিছুই মানতে নারাজ বাট মেনে নিতে হয়, কেনো না কোনো কিছু পার্মানেন্ট হয় না, সবকিছু বদলে যায়, এই জীবনের চাওয়া পাওয়া সময় মানুষ জায়গা এবং কী আমরা নিজেরাও, তাই কেনোকিছু নিয়ে যেমন আফসোস করতে নেই, তেমনিভাবে কারো উপর বেশি প্রত্যাশা রাখতে নেই, কারো উপর প্রত্যাশা না রেখে মোনাজাতে নিজের মর্জি তুলে ধরবে, তুমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারবে, তোমার নসিব তোমার দোয়াও চেয়েও বেটার হয়েছে।
আরাত একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে তাকবীরের বুক থেকে মাথা তুলে মলিন হেঁসে তাকবীর কে দেখতে দেখতে ধীর কন্ঠে বলল,
___" আমি ভুল করেছি, আমার সুখ ভালোবাসা ঘরে ফেলে, ভুল মানুষের পিছনে আমার সুখ খুঁজতে ব্যস্ত ছিলাম,আমার ভুলের শাস্তি স্বরূপ আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় একজন কে হারিয়ে ফেললাম,বুঝলাম আমি তাঁর শুধুই কাছের ছিলাম,মনে আর ছিলাম কই!
তাকবীর আরাত কে নিষ্পলক দেখছে,চঞ্চল হাসিখুশি মেয়েটার মধ্যে নেই কেনো চঞ্চলতা, মুখে লেগে আছে ব্যর্থতা, প্রিয় কিছু হারিয়ে ফেলার চাহনি, যা কেউ দেখলে বলে দিতে পারবে, মেয়েটা ভিতর থেকে ভেঙ্গে পড়েছে, নতুন করে গড়ে উঠতে হয়তো সময় লাগবে, ছোট থেকে বেড়ে উঠা দুই দেহ এক প্রায় হটাৎই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাওয়া কী সহজে নতুন করে গড়ে উঠতে পারে,তাকবীর থাকতে অসম্ভব কিছু না, তাকবীর তাঁর বউকে ভেঙ্গে পড়তে দিবে না, তাকবীর খুব মনোযোগ সহকারে আরাতের কথা গুলো শুনছে, আরাত ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় মলিন হেঁসে পুনরায় বলে উঠলো,
___" আপনি ভাববেন না আমার কষ্ট হচ্ছে, অনেক কিছুই না পেয়ে আফসোস করছি অথচ পরে দেখছি সেটা না পাওয়াটাই আমার জন্য উওম ছিলো, হয়তো রশ্মি কে হারিয়ে ফেলার মধ্যে আমার জীবনে উওম কিছু অপেক্ষা করছে।
আরাতের কথায় তাকবীরের মুখে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠলো, দু'হাতে আরাতের গাল ধরে নাকে নাক ঘষতে ঘষতে আদুরে গলায় বলে উঠলো,
___" এই তো লক্ষ্মী বউ আমার।
তাকবীরের আদুরে গলায় আরাত মলিন মুখে ফিক করে হেঁসে উঠলো, তাকবীর আরাতের মন কিছুটা ঠিক হতে দেখে পুনরায় বুঝানোর ন্যায় বলে উঠলো,
___" আমাদের লাইফে ক্ষণিকের জন্য ভুল মানুষ আসেই সঠিক মানুষের আগমন ঘটাতে, ভুল মানুষটা না এলে সঠিক মানুষের কদর বুঝতাম না, অতএব যে তোমাকে ভালোবাসা শিকায় সেই ভালোলাগার পুরুষ সঠিক পুরুষ তো সঠিক সময়ে আসে।
আরাত তাকবীরের ন্যায় বলে উঠলো,
___" আর আমার লাইফে সঠিক মানুষটা আপনি, আমাকে আপনার ভালোবাসার মায়া জালে বেঁধে ফেলছেন আপনি, আপনাকে ছাড়া এই মায়াজাল কাটাতে পারবো না আমি।
___" মায়া কাটাতে না জরিয়ে নিতে শিখো।
তাকবীরের কথায় আরাত তাকবীর কে পুনরায় জরিয়ে ধরল, তাকবীরের বুকে মাথা ঠেকিয়ে শান্তিতে চোখ বুঝে নিয়ে নরম সুরে বলে উঠলো,
___" রশ্মি আমার জীবনে এক টুকরো ভালোবাসা ছিলো, আর পুরো আমিময় জুড়ে আপনি আছেন, ইনশাআল্লাহ ইহকাল পরকাল আমার অস্তিত্ব জুড়ে আপনি থেকে যাবেন।
তাকবীর আরাতের মতো দু'হাতে আরাত কে জরিয়ে ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ঝুলে চোখ বুঝে ছোট করে বলল,
___" ইনশাআল্লাহ।
★★★
বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা লেগে গেছে, আরশ মিমের পিছনে পিছনে তালুকদার বাড়ি অবধি এসেছিল, জানা নেই কেনো মিমের পিছু নিয়েছিল,মিম তালুকদার বাড়িতে ঢুকে যাওয়ার পর আরশ পুনরায় কলেজে ফিরে আসে, কলেজ ছুটির পড়ে কলেজে বেশ কয়েক ঘন্টা সময় কাঁটিয়ে বাড়ি ফিরছে মাএ, আরশ রাফি কলেজে থেকেও মাহির রশ্মির বিয়ের কথা তাড়া দুজন জানে না, আরশ বাইক পার্ক করে মুখে শিস বাজিয়ে বাইকের চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে বড়বড় পা ফেলে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো, বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ দেখে আরশের কপাল কুঁচকে এলো, ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে কপাল কুঁচকে পুরো বাড়ি পর্যবেক্ষণ করার মধ্যে দেখলো, আরশের মা-বাবা সোফাতে ঝিম ধরে বসে আছে, হানিফ তাঁদের পাশে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে, আরশের মা-বাবার সামনে সোফাতে রুপা আর তাসিন বসা, তাসিন কে এই বাড়িতে দেখে আরশের কপাল আরো কুঁচকে এলো, শিস বাজানোর আওয়াজে আরশের বাবা-মা আরশের দিকে মুখ তুলে চাইলো, আরশ তাসিন কে দেখে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
___" তুই এই বাড়িতে কী করছিস ?
তাসিন বাঁকা হেঁসে বলে উঠলো,
___" যা আমার করার কথা ছিলো!
তাসিনের কথায় আরশ গম্ভীর মুখে,
___" হোয়াট ?
___" ঠাসসসস।
আরশের মুখ থেকে কথা বের হওয়ার আগে আরশের গালে থাপ্পড় পরলো, তাসিন আগের ন্যায় বাঁকা হেঁসে দেখছে, হানিফ চমকে উঠলো ছোট ভাইয়ের গালে নিজের বাবা কে থাপ্পড় দিতে দেখে, আরশের মা আগের ন্যায় ঝিম ধরে বসে আছে, আরশের গালে থাপ্পড় পরার সঙ্গে সঙ্গে আরশের গাল মেঝের দিকে ঝুঁকে গেলো, চোখ বন্ধ, হানিফ নিজের বাবার কাছে এসে আটকাতে লাগলেন, আরশ চোখ মেলে নিজের বাবার দিকে তাকালো, তানিস কে দেখেই যা বুঝার বুঝতে পেয়েছে, তানিস মিম আর আশরের বিয়ের সবকিছু বলে দিয়েছে, আরশের বাবা আরশ কে থাপ্পড় দিয়ে বলতে লাগলো,
___" তোমার মতো নির্লজ্জ ছেলে আমি আমার লাইফে দুটো দেখিনি, তোমার লজ্জা করলো না, বড় ভাইয়ের হবু বউ কে বিয়ে করতে, মেয়েটা কে সাদাসিধা ভেবেছিলাম কিন্তু মেয়েটা যে এমন বের হবে কল্পনার বাহিরে ছিলো।
আরশ বাবার মুখে মিমের নামে এমন কথা শুনে শক্ত হয়ে হাতে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে জায়গায় দাঁড়িয়ে মেঝের দিকে চেয়ে বলে উঠলো,
___" মিমের নামে উল্টোপাল্টা কথা বলবেন না, মিম খুব ভালো মেয়ে।
আরশের কথায় আরশের মা-বাবা ছেলের দিকে তাকালো, তাসিন অবাক হয়ে বলে উঠলো,
___" বা বা বা বা, আজকে দেখি মিমের প্রতি তো দরদ উঠলে পড়ছে, আঙ্কেলের মুখের উপর কথা বলছিস ?
তাসিনের কথায় উপস্থিত সবার মুখে বিরক্ত প্রকাশ পেলো, হানিফ রাগী গলায় বিরক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
___" আমাদের ফ্যামিলির মধ্যে তুমি নাক গলাবে না, মিমের প্রতি আরশের দরদ থাকবে এটা সিম্পল বিষয়, বিকজ মিম আরশের ওয়াইফ, আর তুমি যে নোংরামি করছো তাঁর ফল ইনশাআল্লাহ তুমি পাবে ওয়েইট এন্ড ওয়াচ।
হানিফের কথায় তাসিনের মন গম্ভীর হয়ে এলো, গম্ভীর গলায় হানিফ কে বলে উঠলো,
___" তুমি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারো না, আমি কার জন্য এসব করছি, শুধু মাএ তোমাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য, আর তুমি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলছো?
হানিফ বিরক্ত মুখে তাসিনের সামনে এসে দাঁড়ালো, তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,
___" আমার জন্য তোমাকে নোংরামি করতে বলি নাই, আমি জাস্ট তোমাকে চেঞ্জ হতে বলছিলাম, তোমার ড্রেস আপ চেঞ্জ করতে বলছিলাম, আর তুমি আমার এতটুকু আস্কারা পেয়ে নিজের মন মতো যা ইচ্ছা করছো ?
তাসিন হানিফের হাত ধরে বলতে লাগলো,
___" দেখো আমি কী করেছি সত্যি টা জাস্ট সবার সামনে বলে দিয়েছি, এছাড়া আমার হাতে কিছু করার ছিলো না, ওই মিম মেয়েটার সঙ্গে আমি তোমাকে মেনে নিতে পারছিলাম না, তুমি তো জানো আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি, তোমাকে ভালোবাসি বলেই আমি সুযোগ বুঝে মিমের সঙ্গে আরশের বিয়ে দিয়ে দিছি, আরশ মিম কে বিয়ে করতো না আমি ওকে বাধ্য করেছি মিম কে বিয়ে করতে, যেন আমাদের মধ্যে মিম আসতে না পারে, আমি তোমাকে ভালোবাসি বলেই তো এ-সব করেছি বলো, আমাদের মধ্যে মিম নেই চলো আমরা আজকেই বিয়ে করে ফেলি।
তাসিনের এতএত কথা হানিফের মন গলাতে পারলো না, তাসিনের হাত নিজের হাত থেকে এক ঝটকায় বের করে দিয়ে হানিফ একনজর নিজের বাবা-মা ছোট ভাইয়ের দিকে চেয়ে পুনরায় তাসিন কে বলতে লাগলো,
___" তুমি যদি আমাকে ভালোবাসতে, তাহলে নিজেকে চেঞ্জ করতে, সাধারণ মেয়েদের মতো চলাফেরা করতে, তোমার পাগলামিতে তোমার প্রতি একটা সফট কনার তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তোমার এই নোংরামিতে তোমার প্রতি ঘেন্না ছাড়া কিছুই আসে না আজকাল।
তাসিন হুট করে হানিফ কে সবার সঙ্গে জরিয়ে ধরে বলতে লাগলো,
___" না, তুমি এভাবে বলতে পারো না, তুমি শুধু আমাকেই ভালোবাসো, আমি তোমার ঘেন্না সহ্য করতে পারবো না, আমি তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসি হানিফ, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না, আমার তোমাকেই চাই।
হানিফ হাতে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
___" আমাকে ছাড়ো তাসিন!
___" না আমি তোমাকে ছাড়বো না, আগে বলো তুমি আমাকে ভালোবাসো, আমাকে বিয়ে করবে ?
হানিফ তাসিন কে ধাক্কা দিতে যাবে তাঁর আগেই, আরশের মা সোফা থেকে উঠে এসে হানিফের কাছে থেকে এক ঝটকায় তাসিন কে ছাড়িয়ে তাসিনের গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো,
___" ঠাসসসস।
সবাই চমকে তাকালো, তাসিন চোখে পানি নিয়ে গালে হাত দিয়ে হানিফের দিকে তাকালো, হানিফ নিজের মা'কে কিছুই বলল না চুপচাপ দেখছে, আরশের মা তাসিন কে থাপ্পাড় দিয়ে বলতে লাগলো,
___" কী মনে করছো, মিম কে আমাদের সামনে খারাপ প্রমাণ করবে আর আমরা তোমাকে মেনে নিবো, অনেক হয়েছে তোমার নোংরামি বের হও বাড়ি থেকে।
আরশের মা তাসিনের হাত ধরে বাড়ি থেকে বের করতে চাইলো, তাসিন আরশের মায়ের পা ধরে বলতে লাগলো,
___" আন্টি আমি হানিফ কে খুব ভালোবাসি আন্টি, হানিফ কে ছাড়া আমার আর কিছুই চাইনা, প্লিজ আন্টি মেনে নিন না আমাকে, আমি ওকে ছাড়া ভালো থাবো না আন্টি প্লিজ আন্টি....
সেই দৃষ্টি এতটাই হৃদয়হরণকারী, এতটাই ব্যাকুল অনুনয়ে ভরা যে মনে হলো সারাজীবনের সমস্ত না-পাওয়া, সমস্ত তৃষ্ণা, সমস্ত আকুলতা এসে ওই দৃষ্টিতে গলে গেছে। যে দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে 'না' বলার ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না। পদ্মজা হার মানল, আবার পালঙ্কে বসল। আলতো করে আরেকটু চুমু এঁকে দিল ক্ষতস্থানে।
আমির আবার বলল, ‘আর একবার।’
পদ্মজা আবার দিল। এবার একটু বেশি সময় নিয়ে।
আমির এবার চোখ বুজল। প্রাণভরা একটা নিঃশ্বাস নিল। স্বপ্নের ভেতর থেকে কথা বলছে এমনভাবে বলল, ‘শেষবার।’
পদ্মজা এবার আর একটা দুটো নয়, পরপর কয়েকটা চুমু দিল। তারপর উঠতে গেল, এবার সত্যিই চলে যাবে বলে ঠিক করল। এক পা বাড়াতেই আমির বিদ্যুৎবেগে ঘুরে উঠে দাঁড়াল, পেছন থেকে দু'হাতে পদ্মজাকে জড়িয়ে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিল।
ভাঙা চাঁদের আলো জানালা দিয়ে এসে পড়ছিল আমিরের প্রশস্ত বুকে, পদ্মজার মুখে।
আমির এক হাতে পদ্মজার পেট জড়িয়ে রেখে অন্য হাতে চুল তুলে নিল, মাথাটা আলতো করে নত করে মুখ ডুবিয়ে দিল রেশমি কালো, ঘন চুলের গভীরে। চোখ বুজল। সময় নিয়ে ঘ্রাণ নিল।
এই ঘ্রাণ নেওয়াই আমিরের রাতের প্রার্থনা। এখানে কোনো শব্দ নেই, কোনো আয়াতও নেই…শুধু আছে একটু উষ্ণতা, একটু সুবাস, আর বুকের ভেতরে চুপচাপ বলে ওঠা, “শুকরিয়া। হাজার শুকরিয়া।”
‘আছে, আছে। পরীক্ষা আছে, পড়তে হবে, সময় নষ্ট করা যাবে না।’
কথাগুলো বলল বটে, কিন্তু ঠোঁটের কোণ মানল না। সেখানে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক টুকরো মিষ্টি হাসি। সে জানে, আমিরের কাছ থেকে এত সহজে ছাড়া মেলে না। কখনো মেলেনি। সে শিকারি, দুর্দান্ত এক শিকারি। যে একবার শিকার ধরলে ছাড়ে না, বরং এমনভাবে আঁকড়ে রাখে যে শিকারও ভুলে যায় পালাতে চেয়েছিল কিনা।
আমির বলল, ‘ঘড়ির কাঁটা না হয় আজ রাতটুকু আমার জন্য একটু বিশ্রাম নিক।’
পদ্মজা আর কথা বলল না। আমিরের বাহুবন্ধনে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দিল। আমিরের সর্বগ্রাসী চুমু কবুল করে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল বাহুবন্ধনে।
‘সময়কে থামিয়ে দেব৷ দরজায় পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকব শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত।’
‘যদি নিজের ইচ্ছেতে ছেড়ে যাই?’
‘ছায়া হয়ে সঙ্গে থাকব।’
‘যদি কোনোদিন ঘৃণা করি?’
‘সেই ঘৃণাটুকুও আতরের মতো গায়ে মেখে নেব।’
‘যদি আমাদের মাঝে বিশাল কোনো দেয়াল দাঁড়িয়ে যায়?
‘আমি সেই দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব, না হয় নিজেই সেই দেয়ালের ইট হয়ে তোমাকে আগলে রাখব।’
‘আর..আর যদি মরে যাই?’
আমির পদ্মজার কানের কাছে মুখ নামিয়ে আনল। একদম কানের লতি ছুঁয়ে ফেলল তার উষ্ণ নিঃশ্বাস। বলল, ‘মস্ত বড় এক দিঘির পাড়ে পাশাপাশি দুটো কবর হবে। আকাশ থেকে জ্যোৎস্না নামলে সেই দুই কবর একসাথে স্নান করবে, শ্রাবণের বৃষ্টিতে দুজন একসাথে ভিজবে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে আমি তখন তোমার কানে কানে বলব,’দেখো পদ্মবতী, আমাদের বিচ্ছেদ ঘটানোর সাধ্য খোদ নিয়তিরও নেই।’পদ্মজার বড্ড ভালো লাগছে৷ বড্ড ভালো। নারী কথাতেই সুখের অথৈ সাগরে ডুবে যেতে পারে। আর এই মানুষটা জানে ঠিক কোন কথাটা বললে সে ডুবে যাবে, কোন শব্দটা তার হৃদয়ের কোন দরজা খুলে দেবে।
‘এত কথা কোথায় শিখলেন?’
‘যখন তোমাকে দেখলাম। যখন তোমার প্রেমে পড়লাম।’
‘এতো কেন ভালোবাসেন?’
‘সেই উত্তর আমার কাছে নেই।’
‘আমার মাঝে মধ্যে খুব ইচ্ছে করে আপনার ভালোবাসার গভীরতা মেপে দেখতে।’
আমির আর একবার দীর্ঘ শ্বাস টেনে নিল, নাক পদ্মজার ঘাড়ে নামিয়ে আনল, চিরচেনা সুবাস বুকভরে টেনে নিল, যে সুবাস তার কাছে আদিম নেশার মতো। এই নেশা মস্তিষ্ককে অবশ করে দেয়, হৃদপিণ্ডকে সজাগ করে তোলে, এই নেশা তাকে প্রতিদিন নতুন করে পাগল বানায়, প্রতিদিন নতুন করে পথহারা করে দেয়। তারপর ঘোরলাগা কণ্ঠে বলল, ‘যতটা ভালোবাসলে কেউ কারোর জন্য মরে যেতে পারে। যতটা ব্যাকুল হলে স্রষ্টার কাছে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দেয়া যায়। আমি ঠিক ততটাই পথভ্রষ্ট তোমার মায়ায়।'
আবেগের প্রবল জোয়ারে পদ্মজা নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাল। এক লহমায় ঘুরে দাঁড়িয়ে চট করে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়াল সে। দুহাতে আমিরকে লতাগুচ্ছের মতো জড়িয়ে ধরল। তার উত্তপ্ত বক্ষপিঞ্জরে মুখ লুকিয়ে ফেলল। সেখানটায় আমিরের শরীরের পৌরুষদীপ্ত ঘ্রাণ আরেক মায়াবী মাদকতা তৈরি করে রেখেছে।
আমির মুহূর্তের মধ্যে এক হ্যাঁচকা টানে পদ্মজাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। ওর পেশীবহুল হাতের বাঁধন দুর্ভেদ্য দেয়ালের মতো। ধীর পদক্ষেপে সে গিয়ে দাঁড়াল খোলা বারান্দায়। মাথার ওপর রুপালি চাঁদ তখন পূর্ণ যৌবন নিয়ে আকাশ আলো করে হাসছে।
আমির আকাশের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। তারপর গলা চড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, ‘দেখ চাঁদ, চেয়ে দেখ...তোর তো নিজের কোনো আলো নেই, ধার করা আলো নিয়ে বড়াই করিস। তাও আবার বুকে একরাশ কলঙ্ক নিয়ে বসে আছিস! আর এদিকে দেখ, আমার বুকের দিকে চেয়ে দেখ। একদম নিখুঁত, একটুও খুঁত নেই, পৃথিবীর সমস্ত পূর্ণিমাকে লজ্জা দেওয়ার মতো এই নিখুঁত নারী আমার মতো এক বুনো শ্যামবর্ণকে ভালোবাসে! তুই তো সারারাত একা পুড়ে খাক হোস, তোর কি হিংসে হচ্ছে না রে? যা, যাহ মেঘের আড়ালে গিয়ে মুখ লুকা। তোর চেয়েও অনেক বেশি উজ্জ্বল চাঁদ আমার বাহুতে বন্দি, তোকে আর কী প্রয়োজন?’
আমিরের কথা শুনে পদ্মজা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। আমিরের গলায় মুখ লুকিয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠল। হাসল আমিরও।
আকাশে, বাতাসে কী আনন্দ! কী আনন্দ!
যেন পৃথিবীর সমস্ত সুখ আজ রাতে ডানা মেলে উড়ে এসে নেমে পড়েছে তাদের চরণে। জমা হয়েছে এই বারান্দায়, এই মুহূর্তে, এই দুটো মানুষের নিঃশ্বাসের ভেতরে।
নাকি আমির তার তুখোড় চতুরতা দিয়ে মন্ত্রী আর বিরোধী দল দুই পক্ষকেই দাবার ঘুঁটি বানিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নেবে?
চুরুটের আগুন নিভে আসছে। আমির সেদিকে তাকাল না। সে ইতোমধ্যে পরের চাল ভাবতে শুরু করেছে।
↓
আমির গাড়ি থেকে নেমে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াল। রাত হয়ে গেছে। বাতাসে শিশিরের হালকা ছোঁয়া। আকাশে অসংখ্য তারা। কিন্তু এসবের দিকে মনোযোগ দেওয়ার ফুরসত নেই তার।
কবির, কুত্তার বাচ্চা কবির... ও আগে জানায়নি পদ্মজা দুপুরে তাকে খুঁজে অফিসে গিয়েছিল, আর এই না-জানানোটাই বুকের ভেতর শূলের মতো বিঁধছে। পদ্মজা কী মনে করে ফিরে গেছে কে জানে। ওর মুখে কি বিষণ্নতার ছায়া পড়েছিল? চোখ কি একটুও ভিজেছিল? নাকি সেই চিরচেনা নিরুদ্বেগ হাসিটা মুখে রেখেই ফিরে গেছে যে হাসি দেখলে আমিরের মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত সুখ বুঝি ওই একটা হাসির কাছে হার মেনে গেছে।
আমির দ্রুতপায়ে হাঁটতে লাগল। প্রতিদিন দেখা হয় পদ্মজার সঙ্গে। প্রতিটি সকাল, প্রতিটি সন্ধ্যা। তবু প্রতিদিন ফেরার সময় মনে হয় সে দীর্ঘ এক মরুপথ পাড়ি দিচ্ছে। বুকের ভেতর এমন সুখের স্রোত জেগে ওঠে যেন এটাই প্রথম দেখা, যেন এই মুহূর্তের আগে পৃথিবীটা কখনো এত রঙিন ছিল না। কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য!
এমন প্রলয়ঙ্কারী প্রেম কেন জন্মাল হৃদয়ে? কে বুনে দিয়ে গেছে এই আগুনের বীজ? এতো সুখ একটা মানুষের মধ্যে কী করে থাকতে পারে? ওতটুকু একটা শরীরে, ওতটুকু একটা হাসিতে? পদ্মজার কথা মনে পড়লে, তার কাছাকাছি যেতে চাইলে…শরীরের প্রতিটি কোণ পুড়ে যায় কীসের যেন এক দহনে। অথচ এই পোড়াতেও এত সুখ যে সে চায় না আগুন নিভুক, চায় না এই দহন থামুক। বরং আরও জ্বলুক, আরও পুড়ুক। এই আগুনের নামই তো পদ্মজা, আর পদ্মজাই তার সমস্ত পৃথিবী।
আমির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল চাপতেই ভেতর থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল। মুহূর্তের মধ্যেই কপাট খুলে গেল। পদ্মজা আগে থেকেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছিল। দরজা খুলতেই আমিরের চোখের সামনে ফুটে উঠল ‘পদ্মজা’ নামক ফুলটি। সৃষ্টিকর্তা যেন তার সমস্ত নিখুঁত কারুকার্য দিয়ে এই মেয়েটিকে গড়েছেন; যার সৌন্দর্যের কাছে সকল সৌন্দর্যও ম্লান হতে বাধ্য।
পদ্মজা মৃদুস্বরে সালাম দিল, ‘আসসালামু আলাইকুম।’’
‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম।’
বলতে বলতে আমির পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরল। আলতো করে চুমু খেল ওর কপালে। উনিশ-বিশ বছরের তরুণী পদ্মজার মাথাটা ঠিক আমিরের হৃদপিণ্ড বরাবর ঠেকে গেল।
পরক্ষণেই নিজেকে একটু ছাড়িয়ে নিয়ে অস্থির গলায় বলল, 'আপনার সাথে জরুরি কথা ছিল। অফিসেও গিয়েছিলাম, পাইনি। কোথায় ছিলেন?’
আমির পদ্মজার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল সোফার দিকে, নিজে বসল, পদ্মজাকেও নিজের কোলে বসিয়ে বলল, ‘এই অধমকে কেন খুঁজছিলেন রানী সাহেবা? বলুন, আপনার কথা শুনতে এই বান্দা সদা প্রস্তুত।’
‘হেয়ালি করবেন না। জরুরি কথা।’
আমির তৎক্ষণাৎ নিজের মুখভঙ্গি এমন করল যেন কোনো উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় মিটিংয়ে বসেছে। গম্ভীর হয়ে বলল, ‘জি ম্যাডাম, বলুন শুনি।’
‘নিলুফারের কথা মনে আছে আপনার?’
আমির একটু ভাবল। নিলুফার পদ্মজার কলেজের বন্ধু। যখন পদ্মজা তার তিন মাস বয়সী কন্যা পারিজাকে হারিয়ে ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছিল, তখন নিলুফার প্রায় প্রতিদিন আসত। চুপ করে পদ্মজার পাশে বসে থাকত। কথা বলত, হাসাত, কখনো কাঁদত। পদ্মজাকে শক্ত রাখার চেষ্টা করত। এমন বন্ধুকে কি ভোলা যায়?
‘মনে আছে। কেন, তার কি বিয়ে ঠিক হয়েছে?’
পদ্মজা মাথা নেড়ে বলল, ‘না! ওকে গত কয়েকদিন ধরে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। নানাবাড়ি গিয়েছিল, সেখান থেকে একদম উধাও হয়ে গেছে।’
‘দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পুলিশ কেমন যেন গা-ছাড়া ভাব দেখাচ্ছে। তেমন কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না। আপনার সাথে তো বড় বড় মন্ত্রী আর এমপিদের উঠাবসা। আপনি কি একটু তদবির করতে পারেন না? অন্তত পুলিশ যেন একটু সিরিয়াসলি তদন্ত করে।’ পদ্মজার চোখের কোণে জল টলমল করছে। আমির স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কপাল কুঁচকে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সংশয়ের সুরে বলল, ‘এত বড় একটা মেয়ে, জনবহুল শহর থেকে হুট করে এভাবে গায়েব হয়ে গেল?’
‘কেউ কিডন্যাপ করলে? ধর্ষণ, খুন, গুম তো এখন প্রতিদিনের খবর হয়ে গেছে। আমি ভাবতেও পারছি না নিলুফারের সঙ্গে এমন কিছু…’ গলা আটকে গেল ওর।
‘আচ্ছা, আমি দেখছি। অস্থির হয়ো না।’
আমিরের কথায় পদ্মজার মনের ওপর চেপে বসা ভারী পাথরটা যেন কিছুটা হালকা হলো। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আমিরের শার্টের কলারটা ঠিক করে দিয়ে বলল, ‘এখন যান ফ্রেশ হয়ে আসুন। শরীর থেকে ঘামের গন্ধ বের হচ্ছে, এভাবে ঘাম নিয়ে বসে থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে।’
‘যাচ্ছি। খাবার রেডি করো না আবার। আব্বা আসছিলেন, উনার সাথেই বাইরে এক জায়গায় খেয়ে নিয়েছি। তবে তুমি যদি চাও, এই অধম আরেকবার পেটপূর্তি করতে রাজি আছে।’
পদ্মজা বিষ্ময়ে থেমে গেল। বলল, ‘আব্বা শহরে এলেন অথচ বাসায় এলেন না, কেন?’
‘আগামীকাল আসবেন। আজ উনার কোন এক পুরোনো বন্ধুর বাসায় গেছেন। অনেকদিন পর দেখা তো, তাই সেখানেই রয়ে গেলেন।’
শব্দটা কানে পড়তেই আমিরের পায়ের গতি একটু থমকে গেল! এত সামান্য যে পদ্মজা হয়তো খেয়াল করেনি। নারায়ণগঞ্জ! সপ্তাহখানেক আগেই তার ছেলেরা নারায়ণগঞ্জ থেকে দুটো মেয়েকে নিয়ে এসেছে! তাদের মধ্যে নিলুফার নেই তো?
↓
আমিরের জন্য রাখা খাবারগুলো গরম করে যত্ন করে গুছিয়ে রাখল পদ্মজা। মনার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখল, মনা ঘুমিয়ে পড়েছে। এই বাড়িতে কাজের মেয়ে হয়ে এসেছিল ও, কখন যে ঘরের মেয়ে হয়ে গেছে তা টেরই পায়নি। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে, যেভাবে কেবল আপনজনের ঘরেই ঘুমানো যায়। পদ্মজা হাত মুছতে মুছতে উপরে উঠে গেল।
আমির দরজার দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসে আছে, সামনে ছড়িয়ে আছে তার লিগ্যাল ব্যবসার কাগজপত্র। খুলনার পাইকগাছা আর সাতক্ষীরার ঘের থেকে আসা তাজা বাগদা আর গলদা চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত করে সে পাঠাত ইউরোপ আর আমেরিকার বাজারে, যেখানে এই চিংড়ির দাম আর চাহিদা দুটোই ছিল আকাশছোঁয়া মর্যাদায়। আমদানিতেও সে ছিল সমান দূরদর্শী। মানুষের ঘরে ঘুরো দুধের চাহিদা বাড়ছে দেখে ডেনমার্ক আর অস্ট্রেলিয়া থেকে আনত বড় বড় কন্টেইনার ভর্তি মিল্ক পাউডার, মালয়েশিয়া থেকে আসত পাম অয়েল, ব্রাজিল থেকে চিনি, আর ইলেকট্রনিক্সের প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ দেখে সিঙ্গাপুর আর জাপান থেকে আনত রঙিন টেলিভিশন, ক্যাসেট প্লেয়ার, আর ঘরোয়া বিলাসজাত নানা পণ্য। একদিকে এই বিস্তৃত সাম্রাজ্য, যেখানে পদ্মজা আসার পর থেকে সোনা ফলছে…অন্যদিকে অন্ধকারের জগৎ, যেখানে নারী পাচার আর অস্ত্র ব্যবসার শিকড় এতটাই গভীরে গেছে যে চাইলেই উপড়ে ফেলা যায় না। এতদিক সামলে আবার পদ্মজাকে সব অন্ধকার থেকে দূরে রাখার যে কঠিন যাত্রা…মাঝেমধ্যে ক্লান্ত লাগে। সব ছেড়ে পদ্মজাকে নিয়ে সন্ন্যাস নিতে ইচ্ছে করে। যেখানে শুধু তারা দুজন, শুধু আলো, শুধু শান্তি। কিন্তু তার তৈরি বিষবৃক্ষ সেটা কখনো হতে দেবে না৷ গিলে ফেলবে নিজের প্রভুকেই। সেও বোধহয় চায় না৷ তিলে তিলে গড়ে তোলা সাম্রাজ্য চাইলেই ছাড়া যায় না৷
‘পিঠে কী হয়েছে?’
পদ্মজার আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর শুনে আমির চমকে ঘুরে তাকাল। পদ্মজা ততক্ষণে দরজা থেকে ছিটকে সরে এসেছে তার দিকে।
আমিরের কাঁধের নিচে একটা টাটকা ক্ষত। মনে হচ্ছে, কেউ ধারালো কিছু দিয়ে আড়াআড়িভাবে কেটে দিয়েছে। পদ্মজার বুকটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরল। ভেতরটা কেমন অসাড় হয়ে আসছে।
‘কথা বলছেন না কেন? কী করে হয়েছে এটা?’
‘শান্ত হও। বড় কিছু না।’
‘বড় কিছু না মানে? এটাকে বড় না বললে বড় কোনটাকে বলবেন? আপনি মানুষ? এত বড় ক্ষত নিয়েও স্বাভাবিক ছিলেন, টুঁ শব্দটিও করলেন না!’
‘ওষুধ লাগিয়েছিলাম। ঠিক হয়ে যাবে।’
‘কী ওষুধ লাগিয়েছেন যে দেখাই যাচ্ছে না? রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে।’
পদ্মজা আর কথা বাড়াল না। কথায় সময় নষ্ট করার মেয়ে সে নয়। একটা ছোট কৌটা আর পরিষ্কার সুতি কাপড় বের করে আনল। তখনকার দিনে ঘরোয়া দাওয়াইয়ের চল ছিল ঘরে ঘরে। রাসায়নিকের চেয়ে প্রকৃতির দাওয়াইয়ে বিশ্বাস ছিল মানুষের বেশি। একটা ছোট পিরিচে সে তৈরি করল কাঁচা হলুদের রস আর খাঁটি নিম তেলের মিশ্রণ। তারপর আলতো হাতে শুকনো রক্ত পরিষ্কার করতে করতে বলল, ‘কার সঙ্গে মারামারি করেছেন?’
‘মারামারি করেছি কেন মনে হচ্ছে?’
‘এমনি মনে হচ্ছে।’
আমির একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘রিদওয়ান এসেছিল।’
এটুকুই যথেষ্ট। পদ্মজা যা বোঝার বুঝে গেছে। এই দুজন সামনা-সামনি হলে যা হওয়ার কথা, তা-ই হয়েছে, যা সবসময় হয়। সে কথা না বাড়িয়ে হলুদের প্রলেপটা আলতো করে লাগাতে শুরু করল পিঠে। আমির একটু কেঁপে উঠল, পশম খাড়া হয়ে গেল গায়ের।
পদ্মজার চোখ টলমল করে উঠল। বলল, ‘খুব জ্বলছে?’
আমির হাসল। কী করে সে বোঝাবে, ক্ষতের জ্বলুনিটা পদ্মজার শীতল হাতের স্পর্শে উল্টো মিলিয়ে যাচ্ছে!
বারান্দা থেকে বাতাস আসছে৷ শীতের শেষ বাতাস, পর্দাগুলো উড়ছে অলসভাবে।
‘পারলে কি আর লাগতাম? আমি কি যেচে মারামারি করার মানুষ?’
আমিরের পিঠের পেছনে পদ্মজা, তবুও সে টের পাচ্ছে পদ্মজা কাঁদছে। আর শুধুমাত্র এই কারণেই আমির আর নিজে মারপিটে নামে না। লোক পাঠায়, নিজেকে আড়ালে রাখে, যতটা সম্ভব নিরাপদ থাকার চেষ্টা করে। এই শরীর তার নিজের নয়, এই শরীর পদ্মজার। শুধুই পদ্মজার। তাইতো সে ব্যথা পেলে পদ্মজা কাঁদে!
পদ্মজা হঠাৎ ঝুঁকে আমিরের ক্ষতস্থানে একটা আলতো চুমু এঁকে দিল। সেই স্পর্শ পাওয়ামাত্র আমিরের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমশীতল, মিষ্টি স্রোত নেমে গেল। লাজুক পদ্মজাও জেনে গেছে প্রেমিকের ক্ষতের ঔষধ কোনো হাকিম বা বৈদ্যের কাছে পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় প্রেমিকার ঠোঁটে!
আমির হাসল। গলা নামিয়ে বলল, ‘ভালো লেগেছে।’
লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল পদ্মজার মুখ। সে উঠতে যাবে, আমির পেছন না ফিরেই বলল, ‘আরেকবার দেবে?’
আমির ভ্রু কুঁচকে রাইফেলটা হাতে নিল। ওটার ওজন আর ফিনিশিং দেখে অবিকল AK-47 মনে হচ্ছে। সে চেম্বার চ্যাক করল, তারপর ট্রিগার টেনে শুধু ক্লিক শব্দটা শুনল। বলল, ‘মালটা তো দেখছি পুরাই AK-47 ’
কেরামত হাতের তালু কচলাতে কচলাতে বলল, ‘আরে না ভাই, এই জন্যই তো আপনের কাছে আসলাম। এইটা ভাই চীনারা বানাইছে, হুবহু সোভিয়েত AK-47 এর মতন। দেখতে কন আর পারফরম্যান্স কন, একদম এক। কিন্তু কারিশমা হইলো অন্য জায়গায়। দামে এইটা অরিজিনাল মালের থেইকা অনেক সস্তা।’
আমির রাইফেলের ব্যারেলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কোয়ালিটি ড্রপ করবে না তো? ফায়ারের সময় হাত থেকে উড়ে গেলে তো খবর আছে।’
‘আরে না ভাই, চীনারা এইখানে কোনো ছাড় দেয় নাই। জ্যাম হওয়ার ভয় নাই। এই মাল যদি একবার চীন থেইকা সরাসরি কন্টেইনারে ভইরা আনাইতে পারি আর দেশের বাজারে ছাড়তে পারি…ভাই রে, পুরা বাজার গরম হইয়া যাইবো। লাখ লাখ না, কোটি টাকা আয় হবে। সামনে নির্বাচনের সময় ক্যাডাররা এই সস্তা আর কড়া মালের জন্য পাগল হইয়া যাইবো।’
আমির রাইফেলটা টেবিলের ওপর রেখে বলল, ‘কাস্টমস আর কোস্টগার্ড একটু কড়া হয়েছে।’
‘সেই জন্যই তো ভাই আপনের কাছে আসা। এই চালান দেশে ঢুকানোর ক্ষমতা আপনের ছাড়া আর কারো নাই। আপনে শুধু একবার হাত দেন আমির ভাই, আমাগো ভাগ্য খুইলা যাবে। এক শিপমেন্ট মাল যেমনে পারেন আনানোর ব্যবস্থা করেন।’
আমির চুরুট ধরাল। বলল, ‘টাকা আর রুটের চিন্তা আমি করতেছি। তুই চীনার সঙ্গে ডিল কনফার্ম কর।’
কেরামত মাথা নেড়ে সায় দিতে যাবে, ঠিক তখনই কোনো আগাম সংকেত ছাড়াই দড়াম করে খুলে গেল আমিরের অফিস কামরার ভারী সেগুন কাঠের দরজাটা। প্রটোকলের তোয়াক্কা না করে ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকে পড়লেন এমপি বজলুল হক।
সাধারণত এমপি আসার আগে তার পিএস ফোন দেয়, বাইরে গানম্যানরা পজিশন নেয়, আজ সেসবের বালাই নেই।
এমপির অনাহূত উপস্থিতিতে ঘরের ভেতরের শান্ত পরিবেশটা এক নিমেষে থমথমে হয়ে গেল। আমির ইশারা করলে কেরামত টেবিল থেকে তার ফাইলটা তুলে মাথা নিচু করে দ্রুতপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় দরজার পাল্লাটা নিঃশব্দে টেনে দিয়ে গেল।
বজলুল হক চেয়ারে বসেই বললেন, ‘আমির সাহেব, বাড়াবাড়ি কইরা ফেলাইতেছেন! কমিশনার সাবের কানে অলরেডি খবর গেছে, আপনি মানুষ চালান করতেছেন। ফিশিং ট্রলারে মাছের বদলে মেয়ে মানুষ পাচারের এই মরণখ্যাল আমি আর সইতে পারুম না। পার্টি থেইকা চাপ আছে। আপনার জন্য আমার চেয়ার নিয়া টানাটানি শুরু হইছে। পার্সেন্টেজ আর প্রোটেকশন মানি দুইটাই ডবল করতে হইবো।’’
‘আপনিও ভুলে যাইয়েন না, আমরা সরকার। আমার একটা সিগন্যালে আপনার ফ্যাক্টরি আর গোডাউন এক রাতে মাটির সাথে মিশায়া দিতে পারি। বড় বেশি উঁচুতে উইঠা গেছেন আপনি।’
আমির বজলুল হকের দিকে একটা খাম এগিয়ে দিল। যেখানে কিছু গোপন ছবি রাখা। ক্রুর হাসি হেসে বলল, ‘উঁচুতে তো আমি এমনি উঠিনি হক সাহেব, আপনাদের কাঁধে পাড়া দিয়েই উঠছি। এই যে ছবিগুলা দেখতেছেন, গত মাসে আপনার ছেলেপেলেরা আমার চালানের পাহারা দিছে, সেইখানে আপনার নিজের ছোট ভাইও ছিল। আমি ডুবলে কিন্তু একা ডুবব না, পুরো দল নিয়ে তলাব।’
ছবিগুলো দেখে বজলুল হকের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বলল, ‘আপনি আমারে ব্ল্যাকমেইল করতেছেন? এই সাহস কই পান? আমরা না থাকলে আপনার এই নারী পাচারের সিন্ডিকেট এক সপ্তাহও টিকবে না।’
আমির শব্দ করে হেসে উঠল এইবার। যেন কৌতুক শুনল মাত্র। বলল, ‘টিকবে না? হক সাহেব, আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন, এই যে মফস্বলের ছেলেপেলেদের নিয়া এসে ঢাকা শহরে মিছিল করান, তাদের হাতে চায়না পিস্তলটা কে তুলে দেয়? আপনাদের নির্বাচনী ফান্ডে কয়েক কোটি কালো টাকা কে সাদা করে দেয়? আমি ছাড়া উপায় আছে আপনাদের? আমি না থাকলে আজ আপনি সংসদে না, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকতেন। আপনারা হলেন আমার পালিত হায়েনা। আমি মাংস ছুঁড়ে দেই বলেই আপনারা কামড়া-কামড়ি করে আমার সাম্রাজ্য পাহারা দেন। আমারে কামড়াতে আসিয়েন না হজম করতে পারবেন না।'
‘আপনি কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করতেছেন। আমরা সরকার চালাই, আমরা পলিসি মেকার। আমরা এদেশের রাজা।’
আমির চেয়ার ছেড়ে উঠে বজলুল হকের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। চোখে চোখ রেখে বলল, 'আপনারা মনে করেন আপনারা দেশ চালান? ভুল! আপনারা হলেন আমার দাবার বোর্ডের একেকটা বোড়ে। আমি আপনাদের হাতে একটা খেলনা (অস্ত্র) ধরিয়ে দেই, আর আপনারা খুশিতে ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে নিজেদের লোকের রক্ত ঝরান। আমার চোখে একেকটা দল মানে কী জানেন? একেকটা বলদের গোয়াল! আমি সামনে ঘাস ছড়িয়ে দেই, আর আপনারা সেই ঘাসের লোভে আমার কন্টেইনার পার করার রাস্তা পরিষ্কার করে দেন। কারে গরম দেখান আপনি?’
বজলুল হক রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন, ‘আপনি কি বলতে চান আমরা আপনার গোলাম?’
'গোলাম না বলে পার্টনার বলেন, শুনতে ভালো লাগবে। আপনাদের রাজনীতি চলে আমার কালো টাকায়, আমার অস্ত্রে... আর আমার ব্যবসা চলে আপনাদের স্ট্যাম্পে। কিন্তু মাথায় উঠতে চাইলে এটা মনে রাইখেন, স্ট্যাম্প মারার জন্য হাত থাকলেই চলে...এখন সেটা আপনি মারেন বা অন্য কেউ! হাত হলেই হলো। যে অস্ত্র আমি আপনাদের দিছি, সেইটার নল আপনার দিকে ঘুরাতে আমার ছেলেদের এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না। রমজানের আগে দয়া করে নিজের মাথা গরম করবেন না। আমারটাও করবেন না। ইফতারের দাওয়াতটা পকেটে নিয়া শান্তিমতো চল যান।'
‘এর ফল কিন্তু ভালো হবে না আমির। তুমি অনেক কথা বইলা ফেলছো।’ বজলুল পূর্ব পরিচয়ের সম্বোধনে চলে গেলেন।
‘ফল তো আমি প্রতিদিন ভোগ করি। এই যে চিংড়ির এক্সপোর্ট দেখতেছেন, এর ভেতরে কতজনের কলিজা পাচার হয়ে গেছে তার খবর আপনার ডিজি সাহেবও জানে না। যান, গিয়া নিজের দল সামলান। কালকের মধ্যে আপনার একাউন্টে ফান্ডের টাকা পৌছে যাবে। এখন আসুন।’
আলমগীর জানালার পর্দা সরিয়ে দেখল, এমপি বজলুল হকের গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে আমিরকে সংশয় নিয়ে বলল, ‘লোকটা এম্পি, তার হাতে সরকারি ক্ষমতা। সে যদি সত্যি সত্যি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আমাদের বিপক্ষে দাঁড়ায়? উনি এক ফোনে তোর ফ্যাক্টরি সিল করে দিতে পারে!’
‘তাহলে উনি নিজেও ডুববে। আমাদের কাছে কি কম অস্ত্র আছে? এই দেশে যোগ্য ব্যক্তির চেয়ে অযোগ্য ব্যক্তিরাই বেশি আসনে বসে। অযোগ্য লোকেদের এটাই সুবিধা, একটু ভয় দেখাইলে এরা কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে।’
‘আমার চিন্তা হচ্ছে। উনি সংসদে বসে! তুই একজন এম্পিকে 'বলদ' বললি? যদি ও ওপর মহলে আমাদের ব্যবসার লিস্টটা ধরিয়ে দেয়?’
‘বজলুল হক এম্পি হয়েছে আমার টাকায়। ওরে এম্পি আমি বানিয়েছি৷ দুই বছরেই শুয়ো** বাচ্চা, নিজের অতীত ভুলে গেছে৷ ও যদি আমাকে ডুবাতে চায়, তবে রশিতে টান দেওয়ার আগেই ওর নিজের গদি ফাঁস হয়ে ওর গলায় ঝুলবে। ও’রে আমার খুব ভালো করে চেনা আছে।’
আলমগীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আমির বলল, ‘বজলুল হককে নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা কোরো না। ও এখন বাড়িতে গিয়ে শান্ত মাথায় নিজের লাভ-ক্ষতির খতিয়ান মেলাবে। আমিরের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার পরিণাম যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেটা বোঝার মতো রাজনৈতিক জ্ঞান ওর আছে। বজলুল অন্য দশটা সাধারণ এমপির মতো না। ওর টিকে থাকাটাই নির্ভর করে আমার দাক্ষিণ্যের ওপর। ও ভালো করেই জানে, ও আমার মাকড়সার জালে আটকে গেছে।’
‘সে তো তুইও আটকে আছিস আমির। তোর সঙ্গে আমরাও একটা বৈশ্বিক মাকড়সার জালে আটকা পড়েছি। জালটা দিন দিন বড় হচ্ছে, জটিল হচ্ছে।’
আমির কিছু বলল না। ধীর পায়ে জানালার কাছে এগিয়ে গেল। বাইরে তখন বিকেল হচ্ছে। দূরে কোথাও একটা গাড়ির হর্ন একবার ডেকে থেমে গেল।
নারী পাচার আর অস্ত্রের আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট এখন তার হাতের মুঠোয়। মধ্যপ্রাচ্যের মসনদে বসে থাকা প্রভাবশালী মন্ত্রী, রাজপুত্র, তেলের টাকায় ফোলা অহংকারী আমিরদের বিকৃত শখের যোগানদাতা সে। দিনের আলোয় যারা ধর্মের ঝান্ডা বহন করে মিছিলে হাঁটেন, রাতের অন্ধকারে তাদের সেই মুখোশের আড়ালের পচা মুখগুলো আমির চেনে হাতের তালুর মতো। তাদের এমন সব ব্যক্তিগত পাপের দলিল, কলঙ্কিত নথিপত্র আমিরের জিম্মায় আছে, যেগুলো একবার জনসমক্ষে এলে ওরা তাসের ঘরের মতো ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
তারাও জানে আমিরের জীবনের দুর্বল শিরাটির কথা। পদ্মজা। তার স্ত্রী। ভুবনমোহিনী এক রূপসি, যার পায়ের নখ থেকে চুলের ডগা পর্যন্ত কোথাও কোনো কলঙ্কের ছায়া নেই।
জানালার কাঁচে সে নিজের প্রতিবিম্ব দেখল। তীক্ষ্ণ চোয়াল, শান্ত চোখ, ঠোঁটের কোণে চুরুটের ধোঁয়া।
এক অদৃশ্য আন্তর্জাতিক লবিস্ট চক্র পাহাড়ের মতো তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। এই ভূ-রাজনৈতিক দাবার খেলায় আমির এমন এক 'স্মুথ অপারেটর', যার একটি ইশারায় বিদেশের গডফাদাররা এদেশের মসনদ এক রাতের মধ্যে উল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তারা আমিরকে পাহারা দেয় নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে। তার মতো নিখুঁত যোগানদাতা এই অঞ্চলে আর দ্বিতীয়টি নেই বলে।
একদিকে দুবাই-কুয়েতের হারেমে নারী পাচারের অন্ধকার বাজারে সে কুড়িয়েছে প্রশ্নাতীত বিশ্বস্ততা। অন্যদিকে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের চালান এনে এদেশের ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদদের মাথায় পরিয়ে দিচ্ছে দম্ভের মুকুট। আমির জানে তার মূল্য কতখানি! তার পতন মানে অনেক বড় বড় প্রাসাদের ভিত নড়ে ওঠা।
আলমগীর খুব নিচু গলায় বলল, ‘তোর যদি কোনোদিন ইচ্ছে হয় এখান থেকে বেরোনোর?’
আমির ঘুরে দাঁড়িয়ে চুরুটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল, ‘এই খেলায় প্রবেশপথ আছে বড় ভাই, প্রস্থানপথ নেই। এখান থেকে বের হতে চাওয়া মানেই নিজের মৃত্যুপরোয়ানা সই করা। তবে যতদিন এই ময়দানে আছি, রাজার মতোই খেলব।’
চার চালানের বকেয়া পাওনা শোধ না করায় সে চুক্তি ভেঙে বিরোধী দলকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে, এই সংবাদ নিশ্চয়ই মন্ত্রীর কানে পৌঁছে গেছে। বিশ্বাসঘাতকতার গন্ধ দ্রুত ছড়ায়! কানে আসন্ন ঝড়ের গর্জন শোনা যাচ্ছে।
সালাহউদ্দিন তারিক রাষ্ট্রযন্ত্রের দাঁতনখ নিয়ে বহু পুরনো শত্রুকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সে কি এবার তাকে পিষে ফেলবে? তার ছদ্মবেশ ভেঙে, তার কাচের গম্বুজে ঢিল ছুড়ে পদ্মজার নিষ্পাপ পৃথিবীটাকে খান খান করে দেবে?
তোমরা চাইলে রিক্তা ইসলাম মায়া'আপুর লেখা উপন্যাস গুলা আমি একটা একটা করে দিতে পারি কারণ সব গুলা একসাথে দেওয়া সম্ভব না যে গুলার পর্ব দেওয়া শেষ ওই গুলাই দিবো,, রানিং গুলো না কারণ তোমরা নিজে'রাই বিরক্ত হয়ে যাও অপেক্ষা করতে করতে আর আমার একটা টেনশন থাকে যে কবে পর্বগুলা পাবো আর তোমাদেরকে দিব,, তার থেকে ভালো যে গুলার পর্ব দেওয়া শেষ আমি ভাবতেছি ওই গুলা দিবো কি বলো তোমরা..?
TAHA
#শেষ_চৈত্রের_ঘ্রাণ
#নূরজাহান_আক্তার_আলো
#পর্_৫৪
_'ভালো হচ্ছে না কিন্তু ছাড়ুন বলছি, ছাড়ুন।'
_'এত সহজে না।'
একথা বলে শীতলের হাত ধরে টানতে টানতে ইয়াসির বাইরে বেরিয়ে এলো। সকালের ঠান্ডা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে। মাথার উপর স্বচ্ছ সুনীল আকাশ। দু'একটা কাক হেঁড়ে গলায় ডাকতে ডাকতে উড়ে যাচ্ছে নিজের গন্তব্যে। এখান থেকে কয়েক মিনিট হাঁটলে দেখা মিলবে একটি নদী। শান্ত নদী ছোটো ছোটো স্রোতে বয়ে নিয়ে চলেছে নিজস্ব নিয়মে। সম্ভবত এটা মেঘনা নদীরই শাখা। তবে জায়গাটা একেবারেই সুনশান।
এখান থেকে লোকালয় আরো অনেক দূরে। ইয়াসির শীতলের হাত ধরে
টেনে নিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। এবং শীতলের হাতটা ছেড়ে দিয়ে পেছনে ঘুরে মুচকি হাসল। ছাড়তে দেখে শীতল এবার বিষ্ময় নিয়ে তাকালে ইয়াসির বলল,
-'আচ্ছা আমি ভিতুর মতো পালাচ্ছি কেন? ভয় পায় নাকি ওই শুদ্ধকে?
মোটেও না! তাহলে শুধু শুধু পালানোর মানেটা কি? উফ! বুঝলে বাবুই
তোমার বোকা হওয়ার রোগটা বোধহয় আমার উপরে ভর করেছে। তা নাহলে আমি ইয়াসির খান এমন করার তো কথা না।'
-'শুদ্ধ ভাই? কই শুদ্ধ ভাই?'
ব্যাকুল সুরে কথাটা বলে শীতল এদিক-ওদিক তাকাল। খুঁজতে লাগল অনেক আশা নিয়ে। কান্নাভেজা কন্ঠে ডাকতেই লাগল করুন সুরে। ওর এই ব্যাকুলতা সহ্য হলো না ইয়াসিরের। সে শীতলকে নিয়ে ফিরে যেতে
যেতে বলল,
-'চলো ভেতরে গিয়ে অপেক্ষা করি? দেখি কখন আসে তোমার শুদ্ধ ভাই? আর আমিও রেডি হই তাকে স্পেশালভাবে স্বাগত জানানোর জন্য।'
ইয়াসিরকে পাল্টি খেতে দেখে শীতল বাকহারা হয়ে তাকিয়ে রইল শুধু।
ভয়ংকর কোনো পরিকল্পনা করছে সেটাও বুঝতে বাকি রইল না। ভয়ে দুরুদুরু বুকে আল্লাহকে ডাকতে লাগল সে। এতক্ষণ গাড়ি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে ইয়াসিরকে বের হতে না দেখে সেখানে বুরাকও উপস্থিত হলো। জলদি বের হওয়ার তাগাদা দিলো। কিন্তু ইয়াসির গোঁ ধরে রইল
সে কোথাও যাবে না। লুকোচুরি খেলা নয় এবার যা হবে সামনাসামনি।
এমন পরিস্থিতিতে ইয়াসিরের কথা শুনে বুরাক এক কোণে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল। টেনশনে দরদর করে ঘামছে সে। খুব ভালো করে বুঝতে পারছে তার জীবনের অন্তিম মুহূর্ত চলে এসেছে। পালাতে গেলে ইয়াসির তাকে শুঁট করবে; না পালালে শুদ্ধর হাতে মরতে হবে। মনে মনে এসব ভেবে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে সাইকো ইয়াসিরের কান্ডখানায় দেখতে লাগল।
এদিকে ইয়াসির শীতলকে সোফায় বসিয়ে খাবার এনে মুখোমুখি বসল।
টেনশনে চুপসে যাওয়া শীতলের দিকে খাবার এগিয়ে দিয়ে খেতে ইশারা করল। কিন্তু শীতল মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালে পুনরায় বলল,
-'খাও।'
-'গলা দিয়ে নামবে না।'
-'পানি দিয়ে গিলো, তবুও খাও।'
-'বলছি তো খাব না।'
-'খাবে,,খেতে হবেই।'
একপর্যায়ে ইয়াসিরের জোরাজুরিতে বাধ্য হয়ে শীতল মুখে খাবার নিল, তারপর কান্নাভেজা সুরে বলল,
-'ছেড়ে দিন না আমাদের? কি ক্ষতি করেছি আমরা? কেন আমাদের পেছনে পড়েছেন আপনি? '
-'আমার ব্যাপারে এতকিছু জানলে কিভাবে?'
-'(.....)'
-'কিছু জিজ্ঞাসা করছি? মুখ খোলো বাবুই। আমি তোমাকে ব্যাড টাচ্ করতে চাই না। আমার কাছে অহেতুক জেদ করে নিজের সর্বনাশ ডেকে এনো না।'
শীতল বুঝল মুখ না খুলে উপায় নেই তাই বলল,
-'স্বর্ণ আপু আপনার ব্যাপারে অনেক কিছু জানে। সেগুলো নোট করে ফাইলে রেখেছিল। ফাইলটা একবার ধরতে গেলে আপু বারণ করেছিল। বারণ করা কাজ করতে ভালো লাগে আমার। কি এমন আছে যে ধরতে বারণ করল সেটা দেখতেই চুপিচুপি ফাইলটা নিয়ে পড়েছি। আর সায়ন ভাইয়া একদিন রেগে আপনাকে গালি দিচ্ছিল আপুকে 'অগ্নিকন্যা' নামে ডাকায়। সেটা শুনেছি। সেই ফাইলে আপনার আবছা ছবিও ছিল সেটা দেখে রেস্টুরেন্টে প্রথমে চিনতে পারি নি তবে পরে চিনতে পেরে আপুর ভয়ে আর কিছু বলি নি। কারণ আপু তখন মারাত্মক রেগেছিল।'
-'তারমানে তোমার বোন আমাকে চিনতে পেরেছিল সেদিন?'
-'হুম। পাবলিক প্লেসে সিনক্রিয়েট করবে না ভেবেই মূলত চুপ ছিল।'
-' আচ্ছা বাবুই, এখন যদি শুদ্ধ আসে চলে যাবে আমাকে ফেলে?'
-'হুম।'
-' খারাপ লাগবে না?'
-'না, কারণ আপনি আমাকে মেরেছেন। যারা আমাকে মারে, বকে তারা আমার শত্রু। শত্রুর কাছে থাকার ইচ্ছে নেই আমার।'
-'আমি আদরও করতে পারি। করে দেখাই?'
-' (...)'
-'ধরো শুদ্ধ এখানে এলো এসে তোমার সামনে দাঁড়াল। দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মারা গেল। আমি শুঁট ফুঁট কিছুই করলাম না তাও মারা গেল। তখন পথ ক্লিয়ার তবুও তুমি আমার হবে না, বাবুই? একটু ভেবে বলো তো?
কেন জানি তোমার সাথে জোরাজুরি করতে ইচ্ছে করে না আমার। যদি করত তাহলে বসে থাকার অবস্থাতেই রাখতাম না তোমায়। জীবনে এই প্রথম কোনো মেয়ের সঙ্গে ভালো করে কথা বলার চেষ্টা করছি। তোমার জেদের কারণে তবুও মার খেলে। জেদ করে বড় বড় বুলি না আওড়ালে মার টা খেতে না পাখি।'
একথা বলে ইয়াসির প্রায়ই জোর করে ইয়াসির শীতলকে খাওয়াল। খুব কাঁদল তবুও একপ্রকার খাইয়েই ছাড়ল। খাওয়ানোর পর ফিচেল হেসে বলল,
-'আপন জনের মৃত্যুতে কাঁদার জন্য হলেও শরীরে এনার্জি থাকা জরুরি। একটু খেলে এবার দেখবে মন ভরে কাঁদতে পারবে।'
একথা বলে ইয়াসির হাত ধুয়ে এসে বুরাককে বলল কী কী করতে হবে। সেই অনুযায়ী বুরাক কাজ করতে লাগল। এদিকে এঞ্জেলিকার দেখানো মানুষটা ভুল ছিল। একজন যুবক তার গর্ভবতী বউকে কোলে করে নিয়ে
যাচ্ছিল হাসপাতালের দিকে। দূর থেকে এঞ্জেলিকা সেই কাঙ্খিত মানুষ ভেবেছিল। কিন্তু যখন দেখল ভুল তখন আবার উড়তে লাগল। সংকেত পেয়ে হন্ন হয়ে খুঁজতে লাগল ডানা ঝাপটিয়ে ঝাপটিয়ে।
এদিকে চলন্ত গাড়িতে বসা শুদ্ধর ফোনে তখন আচমকা লোকেশন শো করল। অবাক হলেও আর অপেক্ষা করার সময় নেই। তখন ইয়াসিরের সিক্রেট ডোনে কাছেই ছিল তারা। এবার গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে খুব দ্রুত
সেখানে পৌঁছাল। বাকি বন্ধুদের এ্যালার্ট করল হাসান। শুদ্ধ গাড়ি থেকে নেমে এগোতে এগোতে কোমরে গুঁজে রাখা পিস্তলটা হাতে নিতে ভুলল না। এটাতে সাইলেন্সার লাগানো এবং তার নিজের নামে লাইলেন্স করা।
তার ক্ষিপ্ত হাঁটার গতি আর থমথমে মুখ দেখে রাগের মাত্রা বুঝতে কষ্ট হলো না হাসানের। কিছু বললে যে হিতে বিপরীতও হবে তাও খুব ভালো করেই জানে সে। তবুও শুদ্ধর হাতটা টেনে ধরে থামাল। তারপর আমতা আমতা করে বলল,
-'ভাই থাম। এত হাইপার হোস না, আমাদের মাথায় রাখতে হবে শীতল এখনো ওদের কাছে। একটা ভুল শীতলের বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না।'
-'(....)'
-' যা করার সাবধানে করতে হবে আমাদের। মনে রাখতে হবে তীরে এসে তরী ডুবানো যাবে না।'
শুদ্ধ থমথমে মুখে চোয়াল শক্ত করে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঢুকল বাড়িটার ভেতরে। কারো পায়ের পদধ্বনি শুনে ইয়াসির মুচকি হাসল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল হাত-মুখ বেঁধে মেঝেতে ফেলা রাখা শীতলের দিকে। শুদ্ধ পৌঁছে গেছে তার লোকরাও তাকে জানিয়েছে। তবুও ওর চোখে মুখে আতঙ্কের লেশ মাত্র নেই। শুধু একবার বুরাকের দিকে তাকালে বুরাক হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়াল। অর্থাৎ তার আদেশ মোতাবেক কাজ সম্পূর্ণ করা হয়েছে।
ঠিক তখনই সেখানে শুদ্ধ উপস্থিত হলো। গেট পেরিয়ে গটগটিয়ে ঢুকল।
শীতল এক বুক আশা নিয়ে এতক্ষণ দরজার দিকেই তাকিয়ে ছিল। তার বিশুদ্ধ পুরুষকে দেখে কান্নার বাঁধ ভাঙল। ইচ্ছে করল দৌড়ে গিয়ে বুকে লুকিয়ে পড়তে। কিন্তু সেটা সম্ভব হলো না তাই অশ্রুভেজা চোখেতাকিয়ে রইল শুদ্ধর দিকে। হাত-মুখ বাঁধা শীতলকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে শুদ্ধর বুকে যেন ঢস নামল। সে এগোতেই শীতল বারবার মাথা নাড়াতে লাগল। গোঁ গোঁ শব্দ করে কাছে যেতে বারণ করল। হঠাৎ এমন করাতে
শুদ্ধ কিছু একটা আন্দাজ করে শান্ত চাহনিতে তাকাল ইয়াসিরের দিকে। টিগার চেপে পিস্তল তাক করতেই ইয়াসিরই বলল,
-'কিরে থামলি কেন? বুকে পাঁটা থাকলে প্রাণ নিয়ে ফিরে যা।'
-'ফিরব তো অবশ্যই তবে তোর হিসাব বরাবর করি।'
শুদ্ধ রক্তচক্ষূ নিয়ে তাকালে ইয়াসির দুই হাতে হাততালি দিয়ে হঠাৎ হো হো হাসল। শুদ্ধকে উস্কে দিতে আরো কিছু বলল। শুদ্ধ পুনরায় এগোতে গেলে শীতলের ছটফটানি বেড়ে গেল। অঝর ধারায় কাঁদতে কাঁদতে সে অনবরত মাথা নাড়াতে লাগল। শুদ্ধ শুনল না বরং শীতলের কাছে যেতে
এগোতেই হাসান খেয়াল করল শুদ্ধর পায়ের কাছে কারেন্টের তার পড়ে আছে। বিনাকারণে তার ফেলে রাখবে কেন? এমন না যে কোনো কাজ চলছে। তার সন্দেহ হলে একটু এগিয়ে দেখল সত্যি সত্যি ওটা কারেন্টের
তার। হতে পারে এটা ইয়াসিরের আরেকটা চাল। হতে পারে তার দিয়েই
কোনো ফাঁদ পেতেছে। হাসানের ধারণা তখন সত্যি প্রমাণ হলো বুরাকের দিকে তাকিয়ে। ওই ছেলেটাও তাকিয়ে আছে শুদ্ধর পায়ের দিকে, শুদ্ধ কখন তারে পা পাড়িয়ে যাবে আর কারেন্টের শক খাবে। এমন শক যে বাপ ডাকারও সময় পাবে না। অতঃপর শীতলের চোখের সামনে মরবে শীতলের বিশুদ্ধ পুরুষ।
শব্দ সংখ্যা : ১১৮৪
To be continue....!!
6 hours ago | [YT] | 66
View 6 replies
TAHA
#শেষ_চৈত্রের_ঘ্রাণ
#নূরজাহান_আক্তার_আলো
#পর্ব_৫৩_লাস্ট_পার্ট
এদিকে চারদিকে ফজরের আজান দিচ্ছে। শুদ্ধ আর হাসান জেট থেকে নেমে হেঁটে যাচ্ছিল চা বাগানের দিকে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে পুরনো চা বাগান আছে। লোকেশন আপাতত সেদিকেই শো করছে। হঠাৎ ট্র্যাক করা লোকশন আর শো ই করছে না। রিং যেখানে থাকবে লোকেশনটাও সেখানেই স্থির। কিন্তু গোল চিহ্নের লাল দাগ দেখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ রিং এর জিপিএস কেউ ডিসকানেক্ট করে দিয়েছে। ফোনের দিকে তাকিয়েই
হাঁটতে হাঁটতে শুদ্ধ এবার থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তার হার্টবিট যেন থমকে গেছে। শীতল জান থাকতে কখনোই রিং খুলবে না। তাহলে কি ধরা পড়ে গেল? নাকি ইয়াসির ধরে ধরেছে? তা নাহলে লোকেশন শো করছে না কেন? শুদ্ধকে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে যেতে দেখে হাসান ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,
-' কি রে চল?'
শুদ্ধ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হাতে থাকা ফোনের দিকে। তবে কি সব শেষ? তার মুখ দেখে হাসানের ভ্রুঁজোড়া কুঁচকে গেল। সে শুদ্ধর নজর অনুসরণ করে ফোনে উঁকি মারতেই দেখে লোকেশন শো করছে না। সে হতবাক হয়ে কিছু বলার আগে শুদ্ধ আকাশের দিকে তাকাল। চারদিকে তখনো ঘুটঘুটে গাঢ় অন্ধকার। দূরে কোনোমসজিদ থেকে আজান ভেসে আসছে। শুদ্ধর জানে না আজ তার কি হলো! বুকের ভেতরটা এ করছে কেন। মনটাই বা কু-ডাকছে কেন। চোখ বন্ধ করলেই শীতলের ব্যথাতুর, কান্নারত মুখখানা চোখের পাতায় ভাসছে কেন। সে শুকনো ঢোক গিলে পুনরায় আশপাশে তাকাল। তারপর জোরে জোরে শ্বাস টেনে বুকের বাঁ পাশে হাত রাখল। এখন অবধি কোনো পরিস্থিতি তাকে কাবু করে পারে নি। সে সর্বদা শান্ত, নিশ্চল। কিন্তু এখন কেন জানি অজানা একটা ভয়ে মনটা বড্ডব্যাকুল হয়ে উঠেছে। সে কিছু ভেবে আকাশের দিকে তাকাল।
তারপর থেমে থেমে শুধু এইটুকু উচ্চারণ করল,
-'ইয়া আল্লাহ্, হয় ওকে সহি সালামতে পাইয়ে দাও নয়তো আমার মৃত্যুও এখানেই লিখে রেখো।'
একথা শুনে হাসান ছলছল চোখে তাকাল শুদ্ধর দিকে তারপর শুদ্ধর কাঁধে হাত রেখে বলল,
-'কিচ্ছু হবে না বন্ধু, আল্লাহ ভরসা।'
শুদ্ধ নিশ্চুপ। পরপর ক'বার ঢোক গিলে পুনরায় তাকাল ফোনের দিকে।
না, কোনোভাবেই কাজ হচ্ছে না। ওদিকে অর্ক, কামরান নজর রাখছিল
ল্যাবে বসেই। কিন্তু লোকেশন শো না করায় তারাও অনবরত ফোনকল দিতে থাকল শুদ্ধকে। তারা সঙ্গে না এলেও বুঝেছে এখন শুদ্ধের মনের অবস্থা। কিন্তু শুদ্ধ কল রিসিভ করল না দেখে ওরা কল করল হাসানকে। হাসান কল রিসিভ করে জানাল সত্যি সত্যি লোকেশন ট্রেস করা যাচ্ছে না। একথা শুনে সবার চিন্তা বেড়ে গেল। হঠাৎ শুদ্ধ ভোরের আকাশের
দিকে তাকিয়ে মুখের কাছে হাত রেখে উচ্চশব্দে ডেকে উঠল,' হেল্প মি
এঞ্জেলিকা! প্লিজ হেল্প!' পরপর তিনবার ডাকতেই হঠাৎ'ই “কুঁ….কুঁকুঁ…" স্বরে সাড়া দিলো সাদা ধবধবে একটা পায়রা। পুরো শরীরই সাদা। এক কথায় চমৎকার তার রুপ! শুদ্ধর ডাক শুনেই চিলের মতো দূর আকাশ থেকে তাকে নিচে নেমে আসতে দেখা গেল। নিজের মালিক ডাকমাত্রই
সাড়া দিতে পেরে সে খুশিতে পাখা ঝাপটাতে-ঝাপটাতে একের পর এক
ডিগবাজি মারতে মারতে উড়ে এলে বসল শুদ্ধর বাড়িয়ে দেওয়া হাতের উপর। তারপর অনবরত ডাকতে থাকল, “কুঁ… কুঁকুঁ…।"
শুদ্ধ তার মাথায় হাত বুলালে সে তালুতে মাথা রাখল। অর্থাৎ তার আরো আদর চায়। কিন্তু এখন হাতে একদমই সময় নেই। তাই শুদ্ধ তার মাথায় চুমু এঁকে ফোন থেকে শীতলের সুস্পষ্ট ছবি দেখাতেই এঞ্জেলিকা হঠাৎ
ফুড়ুৎ করে উড়ে চলে গেল। উড়তে উড়তে একবার পেছনে ঘুরে তাকাল
শুদ্ধর দিকে। তারপর ডান দুটো ঝাপটে ধীরে ধীরে আরো উপরে উড়তে লাগল। একটুপরেই শুদ্ধর ফোনে পরপর নোটিফিকেশন আসতেই বুঝল
এঞ্জেলিকার কাছে থাকা ড্রোনে সব দেখা যাচ্ছে।ফজরের আজান পরও
অন্ধকার থাকায় আকাশ থেকে নিচের তেমন কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
শুদ্ধ হাসানের দিকে তাকাতেই হাসান সম্মতি সূচক মাথা নাড়িয়ে হাসল কেবল। কারণ এঞ্জেলিকা থাকলে শুদ্ধ ঠিক পাবে শীতলের খোঁজ। আর
মালিকের মতোই জেদি এঞ্জেলিকা শীতলের খোঁজ না নিয়ে ফিরবে না।
নোটিফিকেশন যখন আসছেই দাঁড়ানোর সময় নেই তাই তারাও দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। জেট থেকে নেমেই স্যান্ডি গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছিল তাদের। ততক্ষণে সকালের নরম আলো ফুটতে শুরু করেছে।
এঞ্জেলিকার ড্রোনে দেখা যাচ্ছে সে কোনদিকে যাচ্ছে। যেতে যেতে দেখা গেল পুরনো এক বিল্ডিংয়ের উপরেই চক্রাকারে ঘুরছে। শুদ্ধ জুম করে
দেখল কেউ একজন কাউকে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছে ওই বিল্ডিংয়ের
ভেতর। এঞ্জেলিকাও দূর আকাশ থেকে মাটির দিকে ধীরে ধীরে নামছে। তারমানে সে নিশ্চয়ই শীতলকে দেখেছে!
_____
To be continue.......!!
6 hours ago | [YT] | 34
View 3 replies
TAHA
#শেষ_চৈত্রের_ঘ্রাণ
#নূরজাহান_আক্তার_আলো
#পর্ব_৫৩_প্রথম_পার্ট
-'প্রয়োজনে শুদ্ধকে মেরে দেবো তবুও তোমাকে আমি ছাড়ছি না বাবুই পাখি। একদমই ছাড়ছি না!'
একথা শুনে শীতলের হাসির বেগ যেন দ্বিগুন বাড়াল। সে হাসতে হাসতে
জবাব দিলো,
-'আমি ততক্ষণ পর্যন্ত বোকা যতক্ষণ আমার আপনজনরা সুস্থ, নয়তো আমি কিন্তু চৌধুরীদেরই রক্ত! কি যেন বললেন, আমার বিশুদ্ধ পুরুষকে মারবেন? মারা তো দূর, শুধু হাত বাড়িয়ে দেখুন হাতটা হাতের জায়গায় রাখি কী না!'
-'বয়স কত তোমার? সিক্সটিন, সেভেনটিন অর এইটটিন?'
-'বয়স যতই হোক ফিডার খাওয়ার বয়স অন্তত পেরিয়ে এসেছি।'
-'আমার তোতাপাখি এত কথা বলে জানতাম না তো?'
-'প্যারা নিয়েন না ফিরে যাওয়ার আগে আরো অনেক কিছু জানবেন।'
-'ফিরতে দিলে তো।'
-'আমি ফিরবোই! বাবা-মায়ের চিন্তা আমি করি না কারণ আমার বোন
সব সামলে নেবে। কিন্তু ওই যে একজন মুডি পুরুষ আছে না? তার জন্য হলেও আমাকে ফিরতে হবে।'
-'জানো আমার একটা বন্ধু ছিল। তাকে আমি খুব বিশ্বাস করতাম। খুব ভালোবাসতাম। সেও আমাকে ভীষণ ভালোবাসত। একদিন করল কী; আমাকে ডেকে হুমকি দিলো তাকে আমার ব্যবসার শেয়ার দিতে হবে। নয়তো সে নাকি সব ফাঁস করে দেবে। আমিও রাজি হয়ে তাকে বাসায় ডাকলাম। দু'জন ব্রান্ডের ওয়াইন পান করে ঘুমিয়ে গেলাম। তারপর কী হলো জানো বাবুই? সকালবেলা আমি ঘুম থেকে উঠলাম ঠিকই কিন্তু সে আর উঠলই না। কত করে ডাকলাম আমার ডাক শুনলোই না। প্রশান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছে ভেবে আমিও বিরক্ত না করে চলে গেলাম সুদূর নিউইয়র্ক।
এক সপ্তাহ পর ফিরে দেখি সে তার বাড়ি চলে গেছে। টানা চারদিন নাকি মরার মতো ঘুমিয়েছে। ঘুমানোই স্বাভাবিক ওয়াইনের সাথে সেদিন কড়া ডোজের ঘুমের মেডিসিন মিশিয়েছিলাম কী না! হয়তো সেও বুঝেছিল।
এরপর খবর এলো আমার গোপন কিছু ডিলের কথা পুলিশকে জানিয়ে দিয়েছে। বন্ধুরা দুষ্টুমি করবে স্বাভাবিক তাই না? দুষ্টামি ভেবে মাফ করে দিলাম। এরপর দেখি আবার আমার কাজে বাঁধা হচ্ছে সে, পরে ভুলিয়ে ভালিয়ে আমার ডেরায় আনলাম। কত সুন্দর করে বোঝালাম এসব না করতে। কিন্তু সে আমার কথা শুনলোই না। পরে যত্ন করে তাকে বালির
মধ্যে গলা অবধি বালিতে পুঁতে শিরোচ্ছেদ করলাম। চমৎকার হয়েছিল ওর শিরোচ্ছেদ করা। শিরোচ্ছেদ কি বুঝো তো বাবুই?'
-'হুম।'
-'বলো তো কি?'
-'মাথা কেটে ফেলা।'
-'আরে বাহ্, তুমি তো দেখি খুব ইন্টেলিজেন্ট গার্ল।'
-'কিন্তু এই ঘটনা আমাকে কেন শোনালেন? আমরা তো কেউ আপনার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় নি। বরং আপনিই শুরু থেকে আমাদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। চৌধুরী বাড়ির অশান্তির কারণ হয়েছেন।তাহলে আমাদের উচিত না আপনার নিয়ম অনুযায়ী আপনাকেও বালিতে পুঁতে শিরোচ্ছেদ করা?'
-'ভদ্র মেয়েরা এভাবে কথা বলে না বাবুই এবার কিন্তু রাগ হচ্ছে আমার।'
-'রাগ হচ্ছে? ওমা কেন? আচ্ছা রাগ কমানোর মলম আবিষ্কার হয়েছে?
হয় নি, তাই না? আপনি নাকি সায়েন্টিস্ট একটা আবিষ্কার করে ফেলুন না, সমশের ভাই? সাধারণ জনগণের অনেক উপকার হবে কিন্তু। ধরেন, কেউ রেগে গেল ফট করে তার বাড়ির লোক রাগের মলম তার কপালে লাগিয়ে দিলো, ব্যস রাগ চলে গেল। কি দারুণ ব্যাপার তাই না?'
-' আমি কোনো সায়েন্টিস্ট না বাবুই আমি মাফিয়া। মাফিয়া কাকে বলে জানো?'
-'জানি তো। এটাও জানি আপনি স্মাগলিং, অস্ত্র ব্যবসা, মানি লন্ডারিং এর কাজ করেন। বাংলাদেশে আপনার কয়েকটা সিক্রেট ডেনও আছে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, সেসব জায়গার একটা জায়গায় আমরা এখন আছি।'
-'ওহ লাভলি! ব্রাভো বাবুই, ব্রাভো! আর কি জানো আমার ব্যাপারে?'
-'আর? আর..আর ওহ হ্যাঁ মনে পড়েছে আপনার প্রিয় খাবার নারীদেহ।
সুন্দরী নারী খুব যত্ন করে খান আপনি। দোয়া করি, আপনার সঙ্গী যেন ঠিক আপনার মতোই হয়। সেও যেন হাজার জনের বিছানা ঘুরে এসে আপনার সঙ্গের সঙ্গী হতে পারে।'
ইয়াসির হাসল। তবে হাসতে হাসতে শক্ত হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে এমন একটা থাপ্পড় দিলো শীতলের ঠোঁটের সাথে দাঁত লেগে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এলো। আচমকা আক্রমণে প্রতিরোধ করার সময়টুকুও পেল না শীতল। তবে নোনতা ভাব অনুভব করে বুঝল ঠোঁট কেটেছে, জিহবাটাও কেটেছে। সে কাটা ঠোঁট চেপে ধরে হাসল। আবার প্রমাণ হলো পৃথিবীতে হাজার হাজার সুদর্শন পুরুষ থাকলেও শুদ্ধর মতো কেউই হতে পারবে না। কেউ তার অহেতুক বকবক শুনবে না। রাগও দেখবে না। অভিমানও বুঝবে না। যেমন ইয়াসির তাকে এখানে আনার পর থেকেই কত আদুরে সুরে কথা বলে যাচ্ছিল। ডাকের কী বাহার! বা..বাবুই! কিন্তু একপর্যায়ে হাল ছেড়ে তো ঠিকই তাকে রক্তাক্ত করল। এক নিমিষেই আদর শেষ।
তবে তাকে দূর্বল ভেবে কাজটা করলেও শীতলও যে চৌধুরীদের জাত এটা ভুললে চলবে না। সে ওড়নায় দিয়ে রক্ত মুছে বলল,
-' মারলেন কেন?'
-'ইচ্ছে হলো তাই।'
-'ইচ্ছে হলে মারতে হবে? আমি আমার বাবার হালাল কামাই খেয়ে বড় হয়েছি আপনার মতো মাফিয়ার হারাম টাকা নয়। তাহলে আপনি কেন রক্তাক্ত করলেন?'
একথা বলে শীতল তড়িৎ কাঁটা চামচ তুলে ইয়াসির হাতে গেঁথে দেওয়ার আগে ইয়াসির খপ করে হাতটা ধরে নিলো। বিদ্যুৎ গতিতে ওর পুরুষালি শক্তপোক্ত শরীর দিয়ে শীতলকে পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরল। শীতলের আর ক্ষমতা নেই নিজেকে ছুঁটানোর। এখন নড়তেও অক্ষম সে। তার এই
হাল দেখে ইয়াসির শব্দ করে হেসে উঠল। এইটুকু একটা বাচ্চা সে কি না তাকে আক্রমণ করতে আসছে, ভাবা যায়! ব্যাপারটা তার কাছে মজাই লাগল। তারপর সে একহাতের মুঠোয় শীতলেন দুহাত চেপে আরেকটা হাত দিয়ে শীতলের মুখের সামনে আসা চুলগুলো সরাল। লম্বা বিনুনিটা নেড়ে চেড়ে দেখল। এরপর বিনুনির আগা ধরে সেটা সাপের মতো করে টেনে এনে শীতলের গালে ঠেঁকিয়ে মুখ বলল, 'ফুঁস!' একাজ করে নিজে হো হো করে হেসে শীতলের মসৃন কাঁধে খোঁচা খোঁচা দাঁড়িওয়ালা থুতনি ঠেঁকাল। এই পিচ্চির রাগও আছে? সে তো আলাভোলা ভেবেছিল। তবে মানতেই হয় এই মেয়েও চালাক, প্রচুর চালাক। সে আসলে বোকা সেজে থাকে। একথা ভেবে সে শীতলের রক্তাক্ত ঠোঁটে দৃষ্টি ফেলে বলল,
-'কোথায় লেগেছে, দেখি?'
শীতল নিজেকে ছাড়ানোর বৃর্থা চেষ্টা করে রাগে হিসহিসিয়ে জবাব দিলো,
-'ছাড়ুন। অসভ্যের মতো জড়াজড়ি না করে দূরে সরে ভদ্রভাবে কথা বলুন। অসহ্য লাগছে কিন্তু আমার। ছাড়তে বলেছি!'
-'অসভ্য মানুষ অসভ্যতামি করবে এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?'
শীতল জবাব দিলো না ঘৃণার দৃষ্টি ছুঁড়ে অন্যদিকে তাকাল। রাগে শরীর রি রি করছে তার। এত সুদর্শন হয়ে কী লাভ যদি পারসোনালিটি ফিরো লেভেল পার করে! তখন ইয়াসির তার রক্তাক্ত ফোলা ঠোঁটে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল,
-'রাগ করলে সোনা? আচ্ছা সরি আর মারব না। বাড়ি যাবে? চলো দিয়ে আসি?'
একথা শুনে শীতলের ছটফটানি থেমে গেল, সে এবার অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল। ইয়াসিরের হাসি-হাসি মুখ দেখে বোঝার চেষ্টা করল সত্যি নাকি মজা। তাকে এভাবে তাকাতে দেখে ইয়াসির এবার নিষ্পাপ মুখে বলল,
-'আমি ভ্যাম্পায়ার নই তবুও রক্তের তৃষ্ণা পাচ্ছে, কি করে বলো তো?'
-' এখন কি আমার হাত কেটে আপনাকে রক্ত গেলাতে বলছেন?'
-'উহুম, সেসব কিছু করতে হবে না। শুধু একটা কাজ করবে তাহলেই বাড়ি যেতে পারবে, করবে?'
-'হেয়ালি না করে বলুন নয়তো ছাড়ুন। আপনার পারফিউমের গন্ধে গা গুলাচ্ছে আমার।'
-'আমি একপ্রকার জানোয়ার হলেও আমার রুচি সর্বদা হাই লেভেলের স্নো হোয়াইট। আমার পোশাক থেকে শুরু করে সব ব্রান্ডের। আর আমি
জানি আমার পারফিউমের সুগন্ধে তোমার পাগল পাগল লাগছে তাই একথা বলছো।'
-'পাগল-পাগল না ছাঁই। আপনার পারফিউমের থেকে শুদ্ধ ভাইয়েরটা আরো বেশি জোশ। একদম খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। আসছে,,'আমার সবকিছু ব্যান্ডের।'
শেষের কথাটা তাচ্ছিল্য করে টেনে বলতেই ইয়াসির হাতের বাঁধন এতটা শক্ত করল যে শীতল ছটফটিয়ে উঠল। তবুও ইয়াসির ছাড়ল না। যখন কেঁদে ফেলল তখন ঠান্ডা সুরে বলল,
-' কেউ আমাকে ছোটো করতে চাইলে আমি তাকে জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে ফেলি। যেন পরবর্তীতে একাজ করার সুযোগ না পায়। কিন্তু তুমি এসে অবধি বারবার এটাই করছো। আমার কিন্তু পছন্দ হচ্ছে না বাবুই পাখি। একদমই পছন্দ হচ্ছে না। আমাকে রাগিও না, রাগের ফল আমার জন্য তৃপ্তিদায়ক হলেও তোমার জন্য হবে না।'
শীতল এবার আর টু শব্দও করল না। কারণ সে ইয়াসিরের কথার মানে বুঝেছে। তাকে চুপ হতে দেখে ইয়াসির বলল,
-' যাবে বাড়ি? গেলে বিনিময়ে শুধু একটা কাজ করে দেখাও।'
শীতল মুখে জবাব দিলো না তবে চোখ তুলে তাকাল। তখন ইয়াসির আরেকটু গা ঘেঁষে কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
-'বিনাবাঁধায় তোমার ঠোঁটের স্বাদ নিতে দাও। প্রমিস, ছেড়ে দেবো। '
একথা বলতে না বলতেই ইয়াসিরের হাতের ঘড়িটা পিক পিক শব্দ করে উঠল। সে ভ্রুঁ কুঁচকে আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে না পেয়ে সন্দেহের দৃষ্টি ছুঁড়ল শীতলের দিকে। ইয়াসির শীতলকে চেপে ধরলে শব্দটা যেন আরো জোরালো হচ্ছে। সে শীতলকে ছেড়ে দু'পা পিছিয়ে আপাদমস্তক নজর বুলিয়ে বলল,
-'তোমার কাছে কি লুকিয়ে রেখেছ বের করো বলছি। বাবুই রাগিও না আমাকে, তোমাকে বারবার আঘাত করতে খারাপ লাগবে আমার।'
শীতল তার কথা বুঝলেও গোঁ বেচারা মুখ করে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজে নিজের দিকে তাকিয়ে বলল,
-'খালি হাত-পা নিয়ে আপনিই তো আমাকে তুলে নিয়ে এসেছেন। আমি আবার কি লুকিয়ে রাখব? যাই হোক, আপনি কি আমার চোর বলতে চাচ্ছেন?'
ইয়াসির শীতলের কথার ফাঁদে পা দিলো না বরং ভূতগ্রস্তের মতো তার হাতটা টেনে শরীর চেক করতে লাগল। শীতল বাঁধা দিতে গেলেও শুনল না। একপর্যায়ে ইয়াসির কামিজে হাত দিতে গেলে হাতের ঘড়িটা আবার শব্দ করতে লাগল। ইয়াসির এবার তাকিয়ে দেখল হাতের রিং যতবার তার ঘড়িতে লাগছে ততবারই তার ঘড়িটা শব্দ করতে উঠেছে। সে রিং খুলতে গেলে শীতল কিছুতেই খুলতে দেবে না। এবার কেঁদে ফেলল সে। কত আকুতি-মিনুতি করল তবুও ইয়াসির ছাড়ল না। রিং খুলে চেক করে দেখে তার সন্দেহই সঠিক। রিং এ Gps কানেক্টে করা। তারমানে এখানে থাকা ঠিক হবে না। ধারণা মতে, এতক্ষণ কেউ তাদের লোকেশন ট্র্যাক করে ফেলেছে। সে এবার রাগের বশে শীতলকে আরেকটা থাপ্পড় মেরে হিসহিসিয়ে বলল,
-'কি ভেবেছিলি আমাকে ফাঁকি দিবি? পরে দেখছি তোকে আগে এখান থেকে বের হই।'
একথা বলে শীতলের হাত ধরে টানতে টানতে তাকে বাইরে নিয়ে গেল।
যেতে যেতে এতক্ষণ লুকানো ফোনটা বের করে তার সহকারীকে বলল নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য। গাড়ি করে ইয়াসির এবার শীতলকে নিয়ে গেল আরেকটা ডেরায়। সেখান থেকে পাড়ি দেবে দেশের বাইরে।
6 hours ago | [YT] | 46
View 2 replies
TAHA
#তুই_আমার_বিশ্বাস_ছিলি ( কাজিন রিলেটেড)
#জান্নাতি_আক্তার_জারা
#পর্ব_৫৭_লাস্ট_পার্ট
রুপোলী বেগমের শেষের কথায় রাবেয়া তালুকদার রুপোলী বেগম কে ধমকে উঠলো,
___" অনেক বলে ফেলছো রুপোলী, তুমি আমি আমরা কেউ কিছু জানি না, না জেনে মেয়ে কে এভাবে কষ্ট দিও না।
আদিবা তালুকদার চুপ করে আসে, রুপোলী বেগমের কথায় মিম কান্না বন্ধ করে শান্ত হয়ে দেখছে, রুপোলী বেগম কে, রুপোলী বেগম রাবেয়া তালুকদার কে বলে উঠলেন,
___" ভাবী আর কী জানবো, আমাদের কথা না ভেবে বিয়ে করেছে, আমাদের থেকে সবকিছু লুকিয়ে রাখলো, প্রথম থেকে জেদি ছিলো, কিছু বলিনাই, আদরে আদরে বড় করেছি একটাই মেয়ে আমাদের, ওর কারণে আজকে ওর বাবা অসুস্থ হয়েছে, আমরা তো কখনো কেনো কিছুর কমতি রাখিনি, তাহলে এত বড় একটা কথা লুকিয়ে রাখলো কেনো, হানিফের জন্য তো ওকে আন্টি পড়িয়ে দিয়ে গেছে, এখন আমি তাঁদের সামনে কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াবো বলবেন?
রুপোলী বেগমের কথায় তিশা বলে উঠলো,
___" কাকি তুমি কিছুই জানো না, মিম কিভাবে বিয়ে টা করেছে, তুমি আগে সবটা শুনো তারপরে....
তিশার কথায় রুপোলী বেগম আরো রেগে গেলো,
___" তুমি চুপ করো, তুমিও জানো সব ?
তিশা রুপোলী বেগমের ধমকে মাথা নিচু করে নিলো, মিম নিজের মায়ের কথায় তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,
___" তোমার কথা শুনে কেমন লাগছে জানো,আমি তোমার নিজের মেয়ে না, আমার মনে হয় তুমি আমার আগের কথা গুলো ভুলে গেছো,আমি তো কাউকেই বিয়ে করতে রাজি ছিলাম না, এখনো নেই আমি জাস্ট ....
___" কারণ তোমার সঙ্গে আরশের বিয়ে অনেক আগেই হয়ে গেছিলো তাইতো ?
মিমের মুখের কথা কেরে নিয়ে আদিবা তালুকদার গম্ভীর গলায় বলল কথাগুলো, মিম নিজের ফুপুর মুখে এমন প্রশ্ন শুনে এতক্ষণ ধরে রাখা কান্না দমিয়ে রাখতে না পেয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো, আদিবা তালুকদার যে মিম কে অবিশ্বাস করছে এটা আদিবা তালুকদারের কথায় বুঝা যাচ্ছে, মিম নিজেকে এক্সপ্লেইন না করে রুপোলী বেগমের দিকে চেয়ে কান্নাভরা কন্ঠে বলে উঠলো,
___" আমি জানি আমি ভালো মেয়ে না, কারণ ভালো মেয়েরা তো সত্যি কে লুকিয়ে রাখে না, ভালো মেয়েরা তো কলঙ্কিত হয় না, ভালো মেয়েরা তো সবসময় বাবা-মা আত্মীয়-স্বজনের কথা বাদ্য মেয়ের মতো শুনে, আমি খারাপ না তো কী, যার সঙ্গে বিয়ে ঠিক তাঁর ছোট ভাই কে বিয়ে করেছি, তোমাদের চোখে বিয়েটা কিভাবে হয়েছে এটা ফ্যাট না, বিয়ে করেছি এটা ফ্যাট, আমি এই অপবাদ নিয়ে ভালো আছি নাকি নেই, এটা জানা লাগবে না, তোমাদের কাছে আমি অপরাধ করেছি এটা আগে, আচ্ছা আম্মু তোমার মেয়ে ভালো আছে? একবারও জানতে চেয়েছিলে?
মিমের কথায় রুপোলী বেগম নীরব চোখে মিম কে দেখতে লাগলো, মিম চোখের পানি মুছে তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,
___" আমাকে নিয়ে তোমাকে সমাজের কটুক্ষ শুনতে হবে না, কেউ যদি তোমার মেয়ের কথা জানতে চায় তাকে বলে দিয়ো, তোমার মেয়ে মা-রা গেছে, আমার মুখ তোমাকে কখনো আর দেখতে হবে না, আমার কথা কখনো মনে করে কেঁদো না, তোমার মেয়ের জেদ বেশি, সে আর তোমাকে কষ্ট দিবে না, না তাঁর জন্য তোমাকে মানুষের কথা শুনতে হবে।
রুপোলী বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে মিমের দিকে, আদিবা তালুকদার অবাক হয়ে বলে উঠলো,
___" এসব কথার মানে কী মিম ?
মিম হেঁসে উঠে বলল,
___" ফুপি আমি একা থাকতে চাই, আজকে তোমাদের উপর দিয়ে অনেক কিছু গেছে, এর মধ্যে আমিও একজন, শুধু আজকের রাত টা আমাকে সহ্য করো, আমার মুখ আর তোমাদের দেখতে হবে না, প্লিজ আগের মতো এখন একা ছাড়ো।
মিমের বারবার এমন কথায় তিশা আদিবা তালুকদার অবাক হয়ে দেখছে মিম কে, রুপোলী বেগম এবার বেশ রাগী গলায় বললেন,
___" আমাদের সঙ্গে নাটক করছো, তোমার আর আরশের বিয়ে টা কিভাবে হয়েছে আমি জানতে চাই?
মিম রুপোলী বেগমের কথায় উওর না করে তিশা কে ছেড়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পরলো, রুপোলী বেগম মেয়ের গা ছাড়া ভাব দেখে আরো রেগে গেলেন, বিকাল বেলা আদিবা তালুকদার মিমের বাবা কে ফোন সবকিছু বলেন, মিমের বিয়ের খবর শুনে ভদ্র লোক অসুস্থ হয়ে পড়েছে, রুপোলী বেগম মেয়ের কথা শুনে মিমের বাবা কে সঙ্গে তালুকদার বাড়িতে আসার জন্য রেডি হয়ে যায়, মিম শহরে চলে আসার পর থেকে তিশার নিত্যদিনের কাজ হয়ে গেছে, মিমের বাড়ির উঠানে ফুলগাছ গুলোর যত্ন নেওয়া, এটা মিমের আদেশ, তিশা প্রতিদিনের মতো আজকে বিকালে মিমদের বাড়িতে এসেছিলো, এসেই রুপোলী বেগম আর মিমের বাবা কে রেডি হতে দেখে তিশা জানতে চাইলে তিশা কে শুধু বলে,
___" মিম আরশ কে বিয়ে করেছে, তুমি প্রথম থেকে জানতে সব?
তিশা রুপোলী বেগমের কথা শুনে আমতা আমতা করে, কারণ মিম তিশা কে সবকিছু ফোনে বলছে আগেই, কিন্তু রুপোলী বেগম কিভাবে জানতে পারলো এটা ভেবেই তিশা ঢোক গিলল, তিশা কে আমতা আমতা করতে দেখে রুপোলী বেগম যা বুঝার বুঝতে পেয়েছে, তিশা কে আর কিছু না বলে তালুকদার বাড়িতে আসার জন্য পুনরায় রেডি হতে লাগে, তিশা রুপোলী বেগমের তারাহুরা দেখে জেদ ধরে তিশা আসবে তালুকদার বাড়িতে, রুপোলী বেগম সরাসরি নাকচ করে দেয়, কিন্তু তিশা পিছু ছাড়ে না, রুপোলী বেগম বাধ্য হয়ে তিশা কে নিয়ে আসতে রাজি হয়ে যায়, রুপোলী বেগম তালুকদার বাড়িতে এসেই মিমের রুমে আসো, আর মিমের বাবা নিচে আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদারের সঙ্গে বসে আছে, রুপোলী বেগম মিম কে রাগী গলায় পুনরায় কিছু বলতে নিবে, তাঁর আগেই আরাত মিমের রুমে ঢুকে যায়, আরাত একপলক নিজের মা আদিবা তালুকদার কে দেখে, তিনি আরাত কে দেখে মুখ অন্য দিকে ঘুরায়, রুপোলী বেগম আরাত কে দেখে বেকুব বনে যায়, কারণ মিমের মতো আরাতের চোখমুখ কান্না করে ফুলে আছে, রুপোলী বেগম বুঝে উঠতে পারলেন না, আরাত কেনো কান্না করছে, পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে কেনো, শুধু কী মিম আরশ কে ঘিরে নাকি আরো কিছু ঘটেছে, রুপোলী বেগম বেশি মাথা ঘামালেন না, আরাত রুপোলী বেগম কে বলে উঠলো,
___" মামী আমাকে একটু সময় দিন, আমি বলছি ওদের বিয়ে কিভাবে হয়েছিলো।
আরাত একটু সময় নিয়ে মলিন মুখে বলতে শুরু করলো, সবকিছু শুনার পর রুপোলী বেগমের মন বেশি ক্ষিপ্ত হলো মিমের উপর, কারণ ওইদিন ক্লাস রুমে কী হয়েছিল এটা মিম আরশ ছাড়া কেউ জানে না, আর আরাত যতটুকু দেখেছে,আর তাঁদের বিয়ের পর কী কী হয়েছে সেসব বলছে, রুপোলী বেগম মিমের দিকে চেয়ে আছেন, কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না, উনাদের ধারনা মিম আর আরশ ক্লাসে নোংরামি করছিলো, আর সবাই দেখতে পেয়ে তাঁদের বিয়ে দিয়ে দিছে, রুপোলী বেগম নিস্তব্ধ চোখমুখ নিয়ে রুম থেকে ধীর পায়ে বের হয়ে গেলো, রাবেয়া তালুকদার রুপোলী বেগমের সঙ্গে রুম থেকে বের হয়ে গেলো, আদিবা তালুকদার মিমের পাশে এসে দাঁড়ালো, কিছু বলতে নিবে মিম আদিবা তালুকদারের উপস্থিত বুঝতে পেয়ে মুখে মেকি হাসি টেনে বলল,
___" আর মাএ একটা রাত ফুপি, তাহলে আর তোমাদের এই কলঙ্কিত মেয়েকে দেখতে হবে না।
মিমের কথায় আদিবা তালুকদার মিমের মাথায় হাত রেখে বলল,
___" আমি জানি আমার মিম এমন না, অভিমান করছিস মা, তোর ফুপি আজকে নিজের মধ্যে নেই, একটার পর একটা শকট মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে রে মা, তোরা অনেক বড় হয়ে গেছিস।
মিমের বন্ধ চোখের কোণ থেকে পানি গড়িয়ে পরলো, নিজের মাথায় আদিবা তালুকদারের হাতের উপর হাত রেখে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলল,
___" তুমি এতক্ষণে আসলো কেনো ফুপি, আমার যে তোমাকে খুব প্রয়োজন ছিলো, তুমিও সবার মতো আমাকে ভুল বুঝেছো বলো, দেখো না আম্মু আমার সঙ্গে কিভাবে কথা বলছে, একবারও আমাকে নিজের বুকে জরিয়ে ধরে বললো না, তুই কেমন আসিস মা, তোর কী বেশি কষ্ট হচ্ছিল, তুই ভুল না আমি জানি, আম্মু একবারও বলল না, তুমি আমার একটিবারও খোঁজ নিতে আসলে না, আমি সত্যি খুব খারাপ মেয়ে তাইনা ?
আদিবা তালুকদার মিমের কথা শুনে কান্না করে দিলেন, তিশা আরাত কান্না করছে, আদিবা তালুকদার মিমের মাথার কাছে বসে বলল,
___" তুই আমার সোনা মা, তুই খারাপ না, আজকে আমাদের পরিস্থিতি এমন জায়গায় নিয়ে এসেছে, সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে, কোথায় থেকে কি ঘটে যাচ্ছে, সবকিছু এলোমেলো লাগছে, তুই চিন্তা করিস না, আমি আসি তো, আমরা সবাই মিলে বসবো, তুই যদি আরশের সঙ্গে সংসার করতে চাস আমরা তোকে ধুমধামে নতুন করে আনুষ্ঠানিক ভাবে তুলে দিবো।
মিম আরশের নাম শুনে মুখে মেকি হাসি টেনে বলল,
___" আমার সাথে যেটা ঘটেছে সেটা আমার নসিবে ছিলো তবে ঘটনা সূচনা করার মানুষ টার কর্মফল খুব কঠিন ভাবে পেতে হবে।
আদিবা পুনরায় বুঝলেন না মিমের কথায় মানে, আইরা মিমের রুমে দরজার সামনে এসে একনজর মিম আরাত তিশা কে লক্ষ করে আদিবা তালুকদার কে বললেন,
___" মামনী... বড়-মামনী তোমাকে নিচে ডাকছে, হানিফ ভাইয়া আর তাঁর মা-বাবা এসেছে!
আইরার কথায় আদিবা তালুকদার অবাক হয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন, মিম চোখ মেলে তাকালো আইরার কথা শুনে, আইরা রুমে ঢুকে বিছানার সাইটে বসলো, আরাত তিশা বিছানায় বসে আছে, সবার মুখ মলিন, একদিনে কতকিছু ঘটে গেলো, রশ্মি বাড়ি থেকে চলে গেলো, আরাত আর মাহিরের রিলেশন কথা সবাই জেনে গেলো, মিম আরশের বিয়ে সবার সামনে প্রকাশ পেলো, একদিনে এতকিছু হজম করতে পারছে না কেউ, তারউপর নতুন করে হানিফ আর তাঁর মা-বাবা উপস্থিত হয়েছে তালুকদার বাড়িতে,
চলমান....
সামনে পর্বে তাসিনের জন্য শাস্তি স্বরূপ চমক আছে, আজকের পর্ব ছোট হয়ে গেলো, আগামী পর্ব ইনশাল্লাহ বড় করে দেওয়ার চেষ্টা করবো, গল্প ভালো-খারাপ দুইটাই বলবে
6 hours ago | [YT] | 27
View 9 replies
TAHA
#তুই_আমার_বিশ্বাস_ছিলি ( কাজিন রিলেটেড)
#জান্নাতি_আক্তার_জারা
#পর্ব_৫৭_দ্বিতীয়_পার্ট
সবাই শুধু দেখছে তাসিন কে, কারো মনে তাসিনের জন্য একটু মায়া হলো না, হবে কী করে, তাসিনের এই পাগলামি দেখতে দেখতে সবাই বিরক্ত, প্রায় তিন বছরের বেশি হবে তাসিনের এই পাগলামো গুলো সহ্য করে আসতেছে, তাসিনের সঙ্গে আরশের ফ্রেন্ডশিপ টা ভিন্ন ছিলো, তানিস প্রথম থেকেই প্যান্ট শার্ট পড়ে অভ্যস্ত, ছেলেদের মতো তাঁর চলেফিরা চালচলন, আরশের সঙ্গে মাঝেমধ্যে আরশ দের বাড়িতে আসতো, শুধু আরশ দের বাড়িতে না রাফি মাহির দের বাড়িতে যেত, কিন্তু আরশের বাড়িতে বেশি আসার কারণ ছিলো হানিফ, হানিফ কে প্রথম দেখায় ভালো লেগে যায়, হানিফের নীরবতা মা-বাবার বাধ্য ছেলে, সবসময় চুপচাপ স্বাভাব সবকিছু তাসিনের ভালো লেগে যায়, আরশের মা প্রথম থেকে তাসিন কে পছন্দ করতেন না, কারণ একটাই ছেলেদের মতো চলাফেরা চালচলন পোষাক, উনার কথা মেয়েরা সবসময় শান্তশিষ্ট ভদ্র পোষাকে নমনীয় থাকবে, আরশ কে মাঝেমধ্যে বকাঝকা করতেন তাসিনের সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ করার জন্য, আরশ কর্ণপাত করতো না মায়ের কথা, তাসিন আরশ দের বাড়িতে এসে হানিফের সামনে এসে এটাওটা করে নিজের অনুভূতি বুঝাতে শুরু করে, কিন্তু হানিফ নিজের মায়ের মতো তাসিন কে পছন্দ করতো না, হানিফ তাসিন কে পছন্দ করে না জানার পড়ে তাসিনের পাগলামো শুরু হয়ে গেলো, হুটহাট হানিফ কে রাস্তা ঘাটে বিরক্ত করতে লাগলো, এতে আরশ থেকে শুরু করে আরশের বাবা-মা হানিফ সবাই বিরক্ত সঙ্গে অধিষ্ঠিত হতে লাগে, শেষ পর্যন্ত আরশ নিজে তাসিনের বাবা-মা কে বলে সবকিছু, কিন্তু তাঁদের কথা তাসিন যা চাইবে তাই করবে, বাবামায়ের কথা শুনে তাসিন আরো বেশি আস্কারা পেয়ে যায়, শেষমেশ আরশের মা তাসিন কে অপমান করে, আরশ দের বাড়িতে আসতে বারণ করে দেয়, উনার কথা তাসিন কে কখনো নিজের ঘরে তুলবে না, দিনদিনে তাসিনের পাগলামো তে হানিফ দুর্বল হয়ে যায়, তাসিন কে বলে দেয় তুমি নিজেকে চেঞ্জ করো, তোমার চলাফেরা লাইফ স্টাইল সবকিছু চেঞ্জ করতে পারলে আমি তোমাকে ভালোবাসবো, এতে তাসিন ধরে নেয় হানিফ তাঁকে ভালোবাসে, হানিফ তাঁর হয়ে গেছে,
হানিফ কে তাসিনের প্রতি দুর্বল হতে দেখে আরশের বাবা-মা বড় ছেলের জন্য মেয়ে দেখতে শুরু করে, শহরে মেয়ে উনার পছন্দ না, ভদ্র মহিলার পছন্দ মেয়ে ধার্মিক সাধারণত সঙ্গে নম্রভদ্র, আর দূরে গ্রামে বিয়ে করাবে যেন তাসিন কেনো ভেজাল করতে না পারে, মিমের ছবি দেখে উনাদের পছন্দ হয়ে যায়, এজন্য হানিফ কে সঙ্গে নিয়ে একদম মিম কে দেখতে চলে যায়, হানিফ যেতে চাইছিলো না মেয়ে দেখতে, তাসিন কে ভালো লাগতোনা শুরু করেছিলো, তারপর তাসিন কে কথা দিয়েছিল, তাসিন নিজেকে চেঞ্জ করতে পারলে হানিফ তাসিন কে ভালোবাসবে, এদিকে মা-বাবার মুখের উপর না করতে পারছিলো না,বাধ্য ছেলে মতো মা-বাবার সঙ্গে মেয়ে দেখতে চলো গেলো গ্রামে, কিন্তু বিয়ে ভাঙ্গার সব দায়িত্ব ছোট ভাই কে দিলো, গ্রামে এসে মিম কে দেখে কেনো ফিলিংস কাজ করে নি, দুজন কে যখন আলেদা কথা বলার জন্য ছাঁদে পাঠানো হলো, মিমের চুপচাপ নিরবতা আর মিমের ভনিতা ছাড়া বিয়ে করবে না বলা কথাতে হানিফ অবাক হলো, মুখের উপর এভাবে রিজেক্ট করে দেওয়াতে মিমের বিষয়ে জানতে ইচ্ছা হলো, তাইতো মিম কেনো বিয়ে করবে না, বা কেমন ছেলে পছন্দ, সবকিছু জানতে চাইলো মিমের কাছে, বাড়িতে ফিরে আরশ কে বলে দেয় তুমি মা-বাবা কে ম্যানেজ কর আমি এই মেয়ে কে বিয়ে করবো না, তাসিনের প্রতি নিজের অনুভূতি, সবকিছু আরশ কে বলে এবং বিয়ে ক্যানসেল হয় তাঁর জন্য বাবা-মা কে রাজি করাতে, কিন্তু কয়েকদিন পড়ে যখন বাবামায়ের চাপে হানিফ মিমের সঙ্গে দেখা করতে যায়, তখন থেকে আরশ কে লক্ষ করে,হানিফ কে মিমের পাশে আরশ সহ্য করতে পারে না, রেস্টুরেন্টে মিম সবকিছু খুলে বলে, আরশের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছে, আর আরশ মিমের সঙ্গে কী কী করেছে, সবকিছু শোনার পর থেকে নিজের ভাইয়ের প্রতি রাগ হয়, হানিফ যদি রাগী ভাইদের মতো হতো তাহলে হয়তো আরশ কে পিটাইতে পিটাইতে ঠিক করে দিতো, একটা মেয়ের সঙ্গে এতটা জঘন্য নিকৃষ্ট কাজ করার জন্য, কিন্তু করতে পারেনি এতি ভদ্র ছেলের কারণে, আরশের চোখে নিজেকে ঘিরে জেলাসি দেখে হানিফ মিমের সঙ্গে কথা বলে, আরশ কে দেখিয়ে দেখিয়ে কথা বলে এবং বুঝায় মিম কে তাঁর পছন্দ হয়েছে, মিম কে সে বিয়ে করবে, এতে আরশ আরো জেলাসি ফিল করে, এদিকে নিজের ভাইয়ের পাশাপাশি তাসিনের প্রতি যতটুকু দুর্বলতা ছিলো তা এক নিমেষেই ঘিন্নাতে পরিনতি হয়ে যায়, তাসিন হানিফের জন্য নিজেকে চেঞ্জ না করে আরো আরেকটা মেয়ের জীবন নষ্ট করতে আরশ কে হেল্প করছে, কথাগুলো ভাবলেই শরীরের রক্ত টকবক করে রাগে, কিন্তু একটাই সমস্যা অতি ভদ্র ছেলে,
আজকে তাসিন আরশের বাড়িতে এসে মিম আরশের বিয়ে কথা বলে দেয়, সঙ্গে মিম কে নষ্ট মেয়ের উপাধি দেয়, যেন আরশের বাবা-মা মিম কে খারাপ মেয়ে ভাবে, আর নিজেদের ভুল ধারণা থেকে তাসিন কে বড় ছেলের বউ করে নেয়, আরশের বাবা-মা প্রথমে তাসিন কে বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই দেননি, কিন্তু তাসিন জোর করে ঢুকে প্রথমে মিম আর আরশের কথা বলে, এতে আরশের বাবা-মা শকট হয়ে হানিফের কাছে জানতে চায়, হানিফ বলে হ্যাঁ আরশ মিমের বিয়ে সত্যি হয়েছে, বড় ছেলের মুখে ছোট ছেলে আর এই বাড়ির হবু বউয়ের কথা শুনে তাজ্জব হয়ে যায়, আরশের মা তাসিনের সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো, তাসিন চোখ ভরা পানি নিয়ে একবার হানিফ তো আরেকবার আরশের বাবা-মার দিকে তাকাচ্ছে, এই আশায় তাড়া তাসিন কে মেনে নিবে, আরশের মা তাসিনের সামনে থেকে সরে এসে আরশের সামনে দাঁড়ালো, আরশ নিজের মায়ের থেকে চোখ লুকালো, আরশ কে চোখ লুকাতে দেখে ভদ্র মহিলা কটাক্ষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে উঠলেন,
___" চোখ লোকাচ্ছ কেনো বাপধন, তুমি তো আমার গর্বিত সন্তান, তুমি একটা মেয়ের সন্মান নিয়ে খেলা করছো, তুমি তাঁকে সবার সামনে অপমান করছো, তাঁকে নিয়ে এখনো খেলে যাচ্ছো বা বা বা বা তোমার মতো ছেলে আমি আমার পেতে ধরে ধন্য বাপধন, খুব ধন্য...
___" আম্মু....
___" ঠাসসস ঠাসসস ঠাসসস ঠাসসস
আরশ ভদ্র মহিলাকে অসহায় গলায় ডাকতেই ভদ্র মহিলা আরশ কে এলোপাতাড়ি গালে থাপ্পড় দিলে লাগলেন, থাপ্পড় দিতে দিতে এক পর্যায়ে আরশের কান্না করতে করতে বললেন,
___" আমি তোমাকে এই শিক্ষা দিয়ে বড় করেছি, একটা মেয়েকে কি করে এই সমাজে কলঙ্ক করতে চেয়েছিলে তুমি, একবারও নিজের মায়ের কথা মনে এলো না তোমার, আমাদের শিক্ষার তুমি এই প্রতিদান দিলে, তুমি কী করে পারলো মিমের সঙ্গে এমন করতে, হ্যাঁ মানলাম সব শেষে বিয়ে করছো, তাহলে মিম কে সম্মান মর্যাদা দিয়ে ঘরে তুললে না কেনো, তুমি যানো একটা মেয়ে কলঙ্ক হওয়ার খেসারত, তুমি বুঝো মেয়েটা একা একা নিজের সঙ্গে কতটা যুদ্ধ করে বেঁচে আছে, এসেছিলো তো আমাদের বাসায়, একবার মনে হয়নি মেয়েটার মনের মধ্যে কী চলছে, মনে হাজারো কষ্ট নিয়ে আমাদের সামনে হাসে খেলে থাকছে, তুমি কী করে পারলে বিয়ে করে তোমার বউ কে রাস্তায় ফেলে আসতে, একটা মেয়ের জন্য কতটা অপমান তুমি বুঝতে পারছো, মেয়েটা নিজের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে এটাই তো অনেক, ছিহ লজ্জা করছে আমার তোমার মতো ছেলেকে পেতে ধরেছি, আমার ভাবতেই শরীর ঘিনঘিন করছে, মিম একা একা কতটা সভার করছে।
ভদ্র মহিলা কান্না করতে করতে কথা গুলো বললো, আরশ নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাপুরষ ভাবছে, তাঁর জন্য তাঁর মা কান্না করছে এর চেয়ে লজ্জা আর কী হতে পারে, আজকে বুঝতে পারছে মিম কে কতটা কষ্ট দিয়েছে, সবার সামনে প্রকাশ না করলো রাতের অন্ধকারে কতটা কান্না করেছে মেয়েটা, একটা মেয়েকে বিয়ে করে রাস্তায় ফেলে আসা মেয়েটার জন্য কতটা অপমান, শুধু সেই মেযেটা বুঝবে, আরশ নিস্তব্ধ হয়ে মেঝের দিকে চেয়ে আছে, মুখে কোনো কথা নেই, চোখটা নিমেষেই লাল টকটকে হয়ে গেছে, আরশের বাবা ভদ্র মহিলাকে শান্ত হতে বললেন, ভদ্র মহিলা হানিফ কে বলল,
___" হানিফ গাড়ি বের করো, আজকেই তালুকদার বাড়িতে যাবো, আমার বউ মাকে আমার বাড়িতে তাঁর প্রাপ্ত মর্যাদা দিয়ে ঘরে তুলবো।
কথাটা বলে ভদ্র মহিলা হানিফের দিকে তাকালো, হানিফ মাথা ঝাকিয়ে বাহিরে যেতে লাগলো, হানিফ কে বাহিরে যেতে দেখে তাসিন হানিফের পিছু নিতে নিলো, আর ভদ্র মহিলা তাসিন এর হাত ধরে আটকে দিয়ে বলল,
___" আমার ছেলের থেকে দূরে থাকো।
তাসিন অসহায় কন্ঠে বলল,
___" আন্টি আমা.......
___" তোমার একটা কথাও শুনতে ইচ্ছুক না আমি।
ভদ্র মহিলা তাসিন এর হাত ছেড়ে দিয়ে একপলক আরশ কে দেখে বাড়ি থেকে হনহন করে বের হয়ে গেলো, আরশের বাবা বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো, আরশ অপরাধী মুখে সোফাতে বসে পরলো, আরশ যানে মিম আসবে না,
★★★
মিম নিজের বিছানায় হাঁটুতে মুখ গুঁজে মলিন মুখে বসে আছে, আদিবা তালুকদার আহাদ তালুকদার কেউ মিমের সঙ্গে টুঁশব্দ পর্যন্ত করে নি, রশ্মিদের বাড়ি থেকে এসে মিম যে বিছানায় বসে পড়ছে তারপর থেকে আর আদিবা তালুকদার বা অন্য কাউকে দেখা যায়নি মিমের রুমে, মিম কান্না করতে করতে চোখের পানি চোখেই শুকিয়ে গেছে, সবকিছু থেকে ছুটে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে, একটা বার আদিবা তালুকদার ভাতিজি কে প্রশ্ন পর্যন্ত করলো না, না কিছু জানতে চাইলো, মিম তাচ্ছিল্য হেঁসে চোখ বন্ধ করে নিলো, গাল গড়িয়ে দুফোঁটা পানি হাতের উপর পরলো, হটাৎই হাতে টান অনুভব হতেই মিম চমকে উঠে চোখ মেলে তাকালো, চোখের সামনে রুপালী বেগমের চেহারা ভেসে উঠতেই মিম রুপোলী বেগম কে জরিয়ে ধরতে নিলে গালে চর পড়লো,
___" ঠাসসসস।
___" কাকি কী করছো।
মিম গালে হাত দিয়ে সামনে তাকাতেই দেখলো রুপোলী বেগমের চোখমুখ রাগে লাল হয়ে আছে, তিশা রুপোলী বেগম কে বাঁধা দিয়ে মিম কে জরিয়ে ধরলো, মিমের চোখে পানি, রুপোলী বেগমের চোখ রাগ থেকে পানিতে পরিনত হয়ে গেছে, রুমের মধ্যে আদিবা তালুকদার রাবেয়া তালুকদার কেও আসতে দেখা গেলো, মিম তিশা কে পেয়ে তিশা কে জরিয়ে ধরলো, রুপোলী বেগম চোখ ভরা পানি আর রাগ নিয়ে বলে উঠলো,
___" তুমি এই কারণে গ্রাম থেকে শহরে এসেছো, একটা বার ভেবে দেখছো গ্রামের মানুষ তোমার এই নষ্টামি জানতে পারলে আমাদের কিভাবে বাঁচতে হবে, মানুষ যদি জানতে পারে, বড় ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছেলের ছোট ভাই কে বিয়ে করেছো, তুমি কেনো এভাবে বিয়ে করছো মিম, আমার জবাব চাই, তোমাকে আমরা কিসের কষ্ট দিয়েছি জার জন্য আমাদের শাস্তি দিচ্ছো তুমি, তোমার আব্বু অসুস্থ হয়ে পড়েছে, শুধু মাএ তোমার কারণে, তোমাকে ইচ্ছা করছে শেষ করে ফেলতে, এইদিন দেখার জন্য তোমাকে বড় করেছি, আগে যদি জানতাম তুমি এমন হবে তোমাকে জন্মের সময় মেরে ফেলতাম।
___" আম্মু....
6 hours ago | [YT] | 30
View 5 replies
TAHA
#তুই_আমার_বিশ্বাস_ছিলি ( কাজিন রিলেটেড)
#জান্নাতি_আক্তার_জারা
#পর্ব_৫৭_প্রথম_পার্ট
তাকবীর বিছানায় বসে আরাতের দিকে চেয়ে নিজের রাগ শান্ত করতে ব্যস্ত, আরাত মেঝেতে বসে কিছুক্ষণ পরপর হেঁচকি তুলছে আর তাকবীরের হাতের ক্ষত স্থান ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছে, আরাত ব্যান্ডেজ করে দিতে দিতে তাকবীরের দিকে চেয়ে তাকবীর কে নিজের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে হেঁচকি তুলে বলে উঠলো,
___" আপনার একটুও ব্যাথা হচ্ছে না ?
তাকবীরের সেই চিরচেনা গম্ভীর গলা,
___" না।
ব্যান্ডেজের দিকে চেয়ে আরাত হেঁচকি তুলে পুনরায় বলে উঠলো,
___" এভাবে বাবা-র উপর রেগে কথা বলা আপনার ঠিক হয়নি।
আরাতের কথায় তাকবীর গা ছাড়া ভাব নিয়ে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠলো,
___" উনার ঠিক হয়নি আমার বউয়ের উপর এভাবে ধমক দিয়ে কথা বলা।
তাকবীর কে নিজের মতো করে উওর করতে দেখে আরাত পুনরায় একি ভঙ্গিমায় বলে উঠলো,
___" আপনি নিজেকে কেনো ব্যাথা দিলেন?
আরাতের প্রশ্নে তাকবীর আরাতের দিকে চেয়ে একটা গম্ভীর নিঃশ্বাস ফেললো,কয়েক মুহূর্ত নিষ্পলক আরাতের মুখ পর্যবেক্ষণ করে ব্যান্ডেজ হাতে আরাতের মুখে হাত রাখলো, আরাত নীরব চোখে তাকবীর কে দেখছে, তাকবীর আরাতের মুখের উপরে এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে আরাতের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে আরাতের কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে নীরব কন্ঠে বলে উঠলো,
___" আমার সামনে বা আড়ালে আমার বউকে কেউ বাজে কথা কেনো উচ্চ স্বরে কথা বললে আমি মেনে নিবো না, মানুষ টা যে কেউ হোক, আমার বউ দুষ্টুমি করবে আমি সহ্য করে নিবো, আমার বউ ভুল করবে আমি আমার ভালোবাসা দিয়ে বুঝিয়ে বলবো, আমার বউ অপরাধ করবে আমি তাঁকে শাসন করবো, মানিয়ে নেওয়ার হলে আমি মানিয়ে নিবো, বোঝানোর হইলে আমি আমার সবকিছু দিয়ে বুঝিয়ে বলবো,আমার বউয়ের উপর শুধুই আমার অধিকার, সবসময় একটা কথা মাথায় রাখবে,এখন তুমি আমার বউ, আমার বউ তুমি, এই আজান তালুকদার তাকবীরের অর্ধাঙ্গিনী।
আরাতের চোখে পানি, ঠোঁটের কোণে সুখময় হাসি, মাথা ঝাকিয়ে হুম বুঝিয়ে তাকবীরের হাতে ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ এর উপর এলোপাথাড়ি ঠোঁট ছুঁয়ে দিতে লাগলো, তাকবীর অপলক দেখছে তাঁর পাগল বউয়ের পাগলামি, আরাত ক্ষতস্থানে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে তাকবীর কে দু'হাতে জরিয়ে ধরলো, তাকবীর আরাতের পাগলামি দেখতে দেখতে একপর্যায়ে মুচকি হেঁসে আরাত কে নিজের বুকের মধ্যে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে নিলো, দুজনের মুখে কেনো কথা নেই, চুপচাপ নীরবতায় যেন সুখ খুঁজতে লাগলো দুজন, আরাত শান্ত মেয়ের মতো তাকবীরের বুকে মাথা ঠেকিয়ে আছে, তাকবীর ব্যান্ডেজ হাতেই আরাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, এভাবে কেটে গেলো কয়েক মিনিট,তাকবীর এবার নীরবতা ভেঙ্গে আরাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
___" বন্ধুত্ব আর ভালোবাসা হৃদয় থেকে হয় জোর করে না, আর জীবনে খারাপ সময় আসা দরকার, খারাপ সময় বুঝতে পাওয়া যায়, কে হাত ধরে রাখে আর কে ছেড়ে দেয়, কে পাশে থাকে আর কে হারিয়ে যায়, আমাদের মন অনেক কিছুই মানতে নারাজ বাট মেনে নিতে হয়, কেনো না কোনো কিছু পার্মানেন্ট হয় না, সবকিছু বদলে যায়, এই জীবনের চাওয়া পাওয়া সময় মানুষ জায়গা এবং কী আমরা নিজেরাও, তাই কেনোকিছু নিয়ে যেমন আফসোস করতে নেই, তেমনিভাবে কারো উপর বেশি প্রত্যাশা রাখতে নেই, কারো উপর প্রত্যাশা না রেখে মোনাজাতে নিজের মর্জি তুলে ধরবে, তুমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারবে, তোমার নসিব তোমার দোয়াও চেয়েও বেটার হয়েছে।
আরাত একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে তাকবীরের বুক থেকে মাথা তুলে মলিন হেঁসে তাকবীর কে দেখতে দেখতে ধীর কন্ঠে বলল,
___" আমি ভুল করেছি, আমার সুখ ভালোবাসা ঘরে ফেলে, ভুল মানুষের পিছনে আমার সুখ খুঁজতে ব্যস্ত ছিলাম,আমার ভুলের শাস্তি স্বরূপ আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় একজন কে হারিয়ে ফেললাম,বুঝলাম আমি তাঁর শুধুই কাছের ছিলাম,মনে আর ছিলাম কই!
তাকবীর আরাত কে নিষ্পলক দেখছে,চঞ্চল হাসিখুশি মেয়েটার মধ্যে নেই কেনো চঞ্চলতা, মুখে লেগে আছে ব্যর্থতা, প্রিয় কিছু হারিয়ে ফেলার চাহনি, যা কেউ দেখলে বলে দিতে পারবে, মেয়েটা ভিতর থেকে ভেঙ্গে পড়েছে, নতুন করে গড়ে উঠতে হয়তো সময় লাগবে, ছোট থেকে বেড়ে উঠা দুই দেহ এক প্রায় হটাৎই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাওয়া কী সহজে নতুন করে গড়ে উঠতে পারে,তাকবীর থাকতে অসম্ভব কিছু না, তাকবীর তাঁর বউকে ভেঙ্গে পড়তে দিবে না, তাকবীর খুব মনোযোগ সহকারে আরাতের কথা গুলো শুনছে, আরাত ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় মলিন হেঁসে পুনরায় বলে উঠলো,
___" আপনি ভাববেন না আমার কষ্ট হচ্ছে, অনেক কিছুই না পেয়ে আফসোস করছি অথচ পরে দেখছি সেটা না পাওয়াটাই আমার জন্য উওম ছিলো, হয়তো রশ্মি কে হারিয়ে ফেলার মধ্যে আমার জীবনে উওম কিছু অপেক্ষা করছে।
আরাতের কথায় তাকবীরের মুখে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠলো, দু'হাতে আরাতের গাল ধরে নাকে নাক ঘষতে ঘষতে আদুরে গলায় বলে উঠলো,
___" এই তো লক্ষ্মী বউ আমার।
তাকবীরের আদুরে গলায় আরাত মলিন মুখে ফিক করে হেঁসে উঠলো, তাকবীর আরাতের মন কিছুটা ঠিক হতে দেখে পুনরায় বুঝানোর ন্যায় বলে উঠলো,
___" আমাদের লাইফে ক্ষণিকের জন্য ভুল মানুষ আসেই সঠিক মানুষের আগমন ঘটাতে, ভুল মানুষটা না এলে সঠিক মানুষের কদর বুঝতাম না, অতএব যে তোমাকে ভালোবাসা শিকায় সেই ভালোলাগার পুরুষ সঠিক পুরুষ তো সঠিক সময়ে আসে।
আরাত তাকবীরের ন্যায় বলে উঠলো,
___" আর আমার লাইফে সঠিক মানুষটা আপনি, আমাকে আপনার ভালোবাসার মায়া জালে বেঁধে ফেলছেন আপনি, আপনাকে ছাড়া এই মায়াজাল কাটাতে পারবো না আমি।
___" মায়া কাটাতে না জরিয়ে নিতে শিখো।
তাকবীরের কথায় আরাত তাকবীর কে পুনরায় জরিয়ে ধরল, তাকবীরের বুকে মাথা ঠেকিয়ে শান্তিতে চোখ বুঝে নিয়ে নরম সুরে বলে উঠলো,
___" রশ্মি আমার জীবনে এক টুকরো ভালোবাসা ছিলো, আর পুরো আমিময় জুড়ে আপনি আছেন, ইনশাআল্লাহ ইহকাল পরকাল আমার অস্তিত্ব জুড়ে আপনি থেকে যাবেন।
তাকবীর আরাতের মতো দু'হাতে আরাত কে জরিয়ে ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ঝুলে চোখ বুঝে ছোট করে বলল,
___" ইনশাআল্লাহ।
★★★
বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা লেগে গেছে, আরশ মিমের পিছনে পিছনে তালুকদার বাড়ি অবধি এসেছিল, জানা নেই কেনো মিমের পিছু নিয়েছিল,মিম তালুকদার বাড়িতে ঢুকে যাওয়ার পর আরশ পুনরায় কলেজে ফিরে আসে, কলেজ ছুটির পড়ে কলেজে বেশ কয়েক ঘন্টা সময় কাঁটিয়ে বাড়ি ফিরছে মাএ, আরশ রাফি কলেজে থেকেও মাহির রশ্মির বিয়ের কথা তাড়া দুজন জানে না, আরশ বাইক পার্ক করে মুখে শিস বাজিয়ে বাইকের চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে বড়বড় পা ফেলে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো, বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ দেখে আরশের কপাল কুঁচকে এলো, ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে কপাল কুঁচকে পুরো বাড়ি পর্যবেক্ষণ করার মধ্যে দেখলো, আরশের মা-বাবা সোফাতে ঝিম ধরে বসে আছে, হানিফ তাঁদের পাশে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে, আরশের মা-বাবার সামনে সোফাতে রুপা আর তাসিন বসা, তাসিন কে এই বাড়িতে দেখে আরশের কপাল আরো কুঁচকে এলো, শিস বাজানোর আওয়াজে আরশের বাবা-মা আরশের দিকে মুখ তুলে চাইলো, আরশ তাসিন কে দেখে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
___" তুই এই বাড়িতে কী করছিস ?
তাসিন বাঁকা হেঁসে বলে উঠলো,
___" যা আমার করার কথা ছিলো!
তাসিনের কথায় আরশ গম্ভীর মুখে,
___" হোয়াট ?
___" ঠাসসসস।
আরশের মুখ থেকে কথা বের হওয়ার আগে আরশের গালে থাপ্পড় পরলো, তাসিন আগের ন্যায় বাঁকা হেঁসে দেখছে, হানিফ চমকে উঠলো ছোট ভাইয়ের গালে নিজের বাবা কে থাপ্পড় দিতে দেখে, আরশের মা আগের ন্যায় ঝিম ধরে বসে আছে, আরশের গালে থাপ্পড় পরার সঙ্গে সঙ্গে আরশের গাল মেঝের দিকে ঝুঁকে গেলো, চোখ বন্ধ, হানিফ নিজের বাবার কাছে এসে আটকাতে লাগলেন, আরশ চোখ মেলে নিজের বাবার দিকে তাকালো, তানিস কে দেখেই যা বুঝার বুঝতে পেয়েছে, তানিস মিম আর আশরের বিয়ের সবকিছু বলে দিয়েছে, আরশের বাবা আরশ কে থাপ্পড় দিয়ে বলতে লাগলো,
___" তোমার মতো নির্লজ্জ ছেলে আমি আমার লাইফে দুটো দেখিনি, তোমার লজ্জা করলো না, বড় ভাইয়ের হবু বউ কে বিয়ে করতে, মেয়েটা কে সাদাসিধা ভেবেছিলাম কিন্তু মেয়েটা যে এমন বের হবে কল্পনার বাহিরে ছিলো।
আরশ বাবার মুখে মিমের নামে এমন কথা শুনে শক্ত হয়ে হাতে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে জায়গায় দাঁড়িয়ে মেঝের দিকে চেয়ে বলে উঠলো,
___" মিমের নামে উল্টোপাল্টা কথা বলবেন না, মিম খুব ভালো মেয়ে।
আরশের কথায় আরশের মা-বাবা ছেলের দিকে তাকালো, তাসিন অবাক হয়ে বলে উঠলো,
___" বা বা বা বা, আজকে দেখি মিমের প্রতি তো দরদ উঠলে পড়ছে, আঙ্কেলের মুখের উপর কথা বলছিস ?
তাসিনের কথায় উপস্থিত সবার মুখে বিরক্ত প্রকাশ পেলো, হানিফ রাগী গলায় বিরক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
___" আমাদের ফ্যামিলির মধ্যে তুমি নাক গলাবে না, মিমের প্রতি আরশের দরদ থাকবে এটা সিম্পল বিষয়, বিকজ মিম আরশের ওয়াইফ, আর তুমি যে নোংরামি করছো তাঁর ফল ইনশাআল্লাহ তুমি পাবে ওয়েইট এন্ড ওয়াচ।
হানিফের কথায় তাসিনের মন গম্ভীর হয়ে এলো, গম্ভীর গলায় হানিফ কে বলে উঠলো,
___" তুমি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারো না, আমি কার জন্য এসব করছি, শুধু মাএ তোমাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য, আর তুমি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলছো?
হানিফ বিরক্ত মুখে তাসিনের সামনে এসে দাঁড়ালো, তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,
___" আমার জন্য তোমাকে নোংরামি করতে বলি নাই, আমি জাস্ট তোমাকে চেঞ্জ হতে বলছিলাম, তোমার ড্রেস আপ চেঞ্জ করতে বলছিলাম, আর তুমি আমার এতটুকু আস্কারা পেয়ে নিজের মন মতো যা ইচ্ছা করছো ?
তাসিন হানিফের হাত ধরে বলতে লাগলো,
___" দেখো আমি কী করেছি সত্যি টা জাস্ট সবার সামনে বলে দিয়েছি, এছাড়া আমার হাতে কিছু করার ছিলো না, ওই মিম মেয়েটার সঙ্গে আমি তোমাকে মেনে নিতে পারছিলাম না, তুমি তো জানো আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি, তোমাকে ভালোবাসি বলেই আমি সুযোগ বুঝে মিমের সঙ্গে আরশের বিয়ে দিয়ে দিছি, আরশ মিম কে বিয়ে করতো না আমি ওকে বাধ্য করেছি মিম কে বিয়ে করতে, যেন আমাদের মধ্যে মিম আসতে না পারে, আমি তোমাকে ভালোবাসি বলেই তো এ-সব করেছি বলো, আমাদের মধ্যে মিম নেই চলো আমরা আজকেই বিয়ে করে ফেলি।
তাসিনের এতএত কথা হানিফের মন গলাতে পারলো না, তাসিনের হাত নিজের হাত থেকে এক ঝটকায় বের করে দিয়ে হানিফ একনজর নিজের বাবা-মা ছোট ভাইয়ের দিকে চেয়ে পুনরায় তাসিন কে বলতে লাগলো,
___" তুমি যদি আমাকে ভালোবাসতে, তাহলে নিজেকে চেঞ্জ করতে, সাধারণ মেয়েদের মতো চলাফেরা করতে, তোমার পাগলামিতে তোমার প্রতি একটা সফট কনার তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তোমার এই নোংরামিতে তোমার প্রতি ঘেন্না ছাড়া কিছুই আসে না আজকাল।
তাসিন হুট করে হানিফ কে সবার সঙ্গে জরিয়ে ধরে বলতে লাগলো,
___" না, তুমি এভাবে বলতে পারো না, তুমি শুধু আমাকেই ভালোবাসো, আমি তোমার ঘেন্না সহ্য করতে পারবো না, আমি তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসি হানিফ, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না, আমার তোমাকেই চাই।
হানিফ হাতে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
___" আমাকে ছাড়ো তাসিন!
___" না আমি তোমাকে ছাড়বো না, আগে বলো তুমি আমাকে ভালোবাসো, আমাকে বিয়ে করবে ?
হানিফ তাসিন কে ধাক্কা দিতে যাবে তাঁর আগেই, আরশের মা সোফা থেকে উঠে এসে হানিফের কাছে থেকে এক ঝটকায় তাসিন কে ছাড়িয়ে তাসিনের গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো,
___" ঠাসসসস।
সবাই চমকে তাকালো, তাসিন চোখে পানি নিয়ে গালে হাত দিয়ে হানিফের দিকে তাকালো, হানিফ নিজের মা'কে কিছুই বলল না চুপচাপ দেখছে, আরশের মা তাসিন কে থাপ্পাড় দিয়ে বলতে লাগলো,
___" কী মনে করছো, মিম কে আমাদের সামনে খারাপ প্রমাণ করবে আর আমরা তোমাকে মেনে নিবো, অনেক হয়েছে তোমার নোংরামি বের হও বাড়ি থেকে।
আরশের মা তাসিনের হাত ধরে বাড়ি থেকে বের করতে চাইলো, তাসিন আরশের মায়ের পা ধরে বলতে লাগলো,
___" আন্টি আমি হানিফ কে খুব ভালোবাসি আন্টি, হানিফ কে ছাড়া আমার আর কিছুই চাইনা, প্লিজ আন্টি মেনে নিন না আমাকে, আমি ওকে ছাড়া ভালো থাবো না আন্টি প্লিজ আন্টি....
6 hours ago | [YT] | 38
View 2 replies
TAHA
আমির হাওলাদার :এক ছদ্মবেশীর উপাখ্যান
#১_লাস্ট_পার্ট
সেই দৃষ্টি এতটাই হৃদয়হরণকারী, এতটাই ব্যাকুল অনুনয়ে ভরা যে মনে হলো সারাজীবনের সমস্ত না-পাওয়া, সমস্ত তৃষ্ণা, সমস্ত আকুলতা এসে ওই দৃষ্টিতে গলে গেছে। যে দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে 'না' বলার ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না। পদ্মজা হার মানল, আবার পালঙ্কে বসল। আলতো করে আরেকটু চুমু এঁকে দিল ক্ষতস্থানে।
আমির আবার বলল, ‘আর একবার।’
পদ্মজা আবার দিল। এবার একটু বেশি সময় নিয়ে।
আমির এবার চোখ বুজল। প্রাণভরা একটা নিঃশ্বাস নিল। স্বপ্নের ভেতর থেকে কথা বলছে এমনভাবে বলল, ‘শেষবার।’
পদ্মজা এবার আর একটা দুটো নয়, পরপর কয়েকটা চুমু দিল। তারপর উঠতে গেল, এবার সত্যিই চলে যাবে বলে ঠিক করল। এক পা বাড়াতেই আমির বিদ্যুৎবেগে ঘুরে উঠে দাঁড়াল, পেছন থেকে দু'হাতে পদ্মজাকে জড়িয়ে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিল।
ভাঙা চাঁদের আলো জানালা দিয়ে এসে পড়ছিল আমিরের প্রশস্ত বুকে, পদ্মজার মুখে।
আমির এক হাতে পদ্মজার পেট জড়িয়ে রেখে অন্য হাতে চুল তুলে নিল, মাথাটা আলতো করে নত করে মুখ ডুবিয়ে দিল রেশমি কালো, ঘন চুলের গভীরে। চোখ বুজল। সময় নিয়ে ঘ্রাণ নিল।
এই ঘ্রাণ নেওয়াই আমিরের রাতের প্রার্থনা। এখানে কোনো শব্দ নেই, কোনো আয়াতও নেই…শুধু আছে একটু উষ্ণতা, একটু সুবাস, আর বুকের ভেতরে চুপচাপ বলে ওঠা, “শুকরিয়া। হাজার শুকরিয়া।”
পদ্মজা জোরহীন গলায় বলল, ‘ছাড়ুন। আমার কাজ আছে।’
আমির চুলে নাক ডুবিয়ে রেখেই বলল, ‘এই রাতেরবেলা তোমার কী এমন কাজ?’
‘আছে, আছে। পরীক্ষা আছে, পড়তে হবে, সময় নষ্ট করা যাবে না।’
কথাগুলো বলল বটে, কিন্তু ঠোঁটের কোণ মানল না। সেখানে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক টুকরো মিষ্টি হাসি। সে জানে, আমিরের কাছ থেকে এত সহজে ছাড়া মেলে না। কখনো মেলেনি। সে শিকারি, দুর্দান্ত এক শিকারি। যে একবার শিকার ধরলে ছাড়ে না, বরং এমনভাবে আঁকড়ে রাখে যে শিকারও ভুলে যায় পালাতে চেয়েছিল কিনা।
আমির বলল, ‘ঘড়ির কাঁটা না হয় আজ রাতটুকু আমার জন্য একটু বিশ্রাম নিক।’
পদ্মজা আর কথা বলল না। আমিরের বাহুবন্ধনে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দিল। আমিরের সর্বগ্রাসী চুমু কবুল করে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল বাহুবন্ধনে।
আমির ভালোবাসে শিল্পীর মতো। তাড়াহুড়ো নেই, অধৈর্য নেই। মায়া নিয়ে, যত্ন নিয়ে ভালোবাসে।
পদ্মজা একসময় চোখ খুলল পিটপিট করে। চোখের সামনে চাঁদ দেখতে পেল। তারা কখন বারান্দার দরজা অবধি চলে এসেছে টেরই পেল না। পা দুটো আমিরের পায়ের উপর, পিঠ আমিরের বুকে। চাঁদের আলো তাদের দুজনকে একসঙ্গে ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
পদ্মজা হঠাৎ আবেগি হয়ে বলল, ‘যদি নিলুফারের মতো আমিও হারিয়ে যাই?’
‘মহাবিশ্বের সব আলো নিভিয়ে দেব, নক্ষত্রদেরও বাধ্য করব তোমাকে খুঁজে আনতে।’
‘তাও যদি আর ফিরে না আসি?’
‘সময়কে থামিয়ে দেব৷ দরজায় পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকব শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত।’
‘যদি নিজের ইচ্ছেতে ছেড়ে যাই?’
‘ছায়া হয়ে সঙ্গে থাকব।’
‘যদি কোনোদিন ঘৃণা করি?’
‘সেই ঘৃণাটুকুও আতরের মতো গায়ে মেখে নেব।’
‘যদি আমাদের মাঝে বিশাল কোনো দেয়াল দাঁড়িয়ে যায়?
‘আমি সেই দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব, না হয় নিজেই সেই দেয়ালের ইট হয়ে তোমাকে আগলে রাখব।’
‘আর..আর যদি মরে যাই?’
আমির পদ্মজার কানের কাছে মুখ নামিয়ে আনল। একদম কানের লতি ছুঁয়ে ফেলল তার উষ্ণ নিঃশ্বাস। বলল, ‘মস্ত বড় এক দিঘির পাড়ে পাশাপাশি দুটো কবর হবে। আকাশ থেকে জ্যোৎস্না নামলে সেই দুই কবর একসাথে স্নান করবে, শ্রাবণের বৃষ্টিতে দুজন একসাথে ভিজবে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে আমি তখন তোমার কানে কানে বলব,’দেখো পদ্মবতী, আমাদের বিচ্ছেদ ঘটানোর সাধ্য খোদ নিয়তিরও নেই।’পদ্মজার বড্ড ভালো লাগছে৷ বড্ড ভালো। নারী কথাতেই সুখের অথৈ সাগরে ডুবে যেতে পারে। আর এই মানুষটা জানে ঠিক কোন কথাটা বললে সে ডুবে যাবে, কোন শব্দটা তার হৃদয়ের কোন দরজা খুলে দেবে।
‘এত কথা কোথায় শিখলেন?’
‘যখন তোমাকে দেখলাম। যখন তোমার প্রেমে পড়লাম।’
‘এতো কেন ভালোবাসেন?’
‘সেই উত্তর আমার কাছে নেই।’
‘আমার মাঝে মধ্যে খুব ইচ্ছে করে আপনার ভালোবাসার গভীরতা মেপে দেখতে।’
আমির এবার মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াল। শক্ত করল হাতের বাঁধন। গর্ব নিয়ে বলল, ‘অতল সাগরের কূল পেলেও আমিরের ভালবাসার তল পাবে না, পদ্মবতী।’
'তবে আপনিই বলুন, ঠিক কতটা ভালোবাসেন?'
আমির আর একবার দীর্ঘ শ্বাস টেনে নিল, নাক পদ্মজার ঘাড়ে নামিয়ে আনল, চিরচেনা সুবাস বুকভরে টেনে নিল, যে সুবাস তার কাছে আদিম নেশার মতো। এই নেশা মস্তিষ্ককে অবশ করে দেয়, হৃদপিণ্ডকে সজাগ করে তোলে, এই নেশা তাকে প্রতিদিন নতুন করে পাগল বানায়, প্রতিদিন নতুন করে পথহারা করে দেয়। তারপর ঘোরলাগা কণ্ঠে বলল, ‘যতটা ভালোবাসলে কেউ কারোর জন্য মরে যেতে পারে। যতটা ব্যাকুল হলে স্রষ্টার কাছে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দেয়া যায়। আমি ঠিক ততটাই পথভ্রষ্ট তোমার মায়ায়।'
আবেগের প্রবল জোয়ারে পদ্মজা নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাল। এক লহমায় ঘুরে দাঁড়িয়ে চট করে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়াল সে। দুহাতে আমিরকে লতাগুচ্ছের মতো জড়িয়ে ধরল। তার উত্তপ্ত বক্ষপিঞ্জরে মুখ লুকিয়ে ফেলল। সেখানটায় আমিরের শরীরের পৌরুষদীপ্ত ঘ্রাণ আরেক মায়াবী মাদকতা তৈরি করে রেখেছে।
খোলা বুকে মুখ ঘষে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আমিও আপনাকে ভালোবাসি৷ খুব ভালোবাসি।’
আমির মুহূর্তের মধ্যে এক হ্যাঁচকা টানে পদ্মজাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। ওর পেশীবহুল হাতের বাঁধন দুর্ভেদ্য দেয়ালের মতো। ধীর পদক্ষেপে সে গিয়ে দাঁড়াল খোলা বারান্দায়। মাথার ওপর রুপালি চাঁদ তখন পূর্ণ যৌবন নিয়ে আকাশ আলো করে হাসছে।
আমির আকাশের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। তারপর গলা চড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, ‘দেখ চাঁদ, চেয়ে দেখ...তোর তো নিজের কোনো আলো নেই, ধার করা আলো নিয়ে বড়াই করিস। তাও আবার বুকে একরাশ কলঙ্ক নিয়ে বসে আছিস! আর এদিকে দেখ, আমার বুকের দিকে চেয়ে দেখ। একদম নিখুঁত, একটুও খুঁত নেই, পৃথিবীর সমস্ত পূর্ণিমাকে লজ্জা দেওয়ার মতো এই নিখুঁত নারী আমার মতো এক বুনো শ্যামবর্ণকে ভালোবাসে! তুই তো সারারাত একা পুড়ে খাক হোস, তোর কি হিংসে হচ্ছে না রে? যা, যাহ মেঘের আড়ালে গিয়ে মুখ লুকা। তোর চেয়েও অনেক বেশি উজ্জ্বল চাঁদ আমার বাহুতে বন্দি, তোকে আর কী প্রয়োজন?’
আমিরের কথা শুনে পদ্মজা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। আমিরের গলায় মুখ লুকিয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠল। হাসল আমিরও।
আকাশে, বাতাসে কী আনন্দ! কী আনন্দ!
যেন পৃথিবীর সমস্ত সুখ আজ রাতে ডানা মেলে উড়ে এসে নেমে পড়েছে তাদের চরণে। জমা হয়েছে এই বারান্দায়, এই মুহূর্তে, এই দুটো মানুষের নিঃশ্বাসের ভেতরে।
—
ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে ভালোবাসা মাখানো পর্ব। আগামী পর্বে বাকি চরিত্ররা এন্ট্রি নিবে।
11 hours ago | [YT] | 77
View 6 replies
TAHA
আমির হাওলাদার : এক ছদ্মবেশীর উপাখ্যান
#১_দ্বিতীয়_পার্ট
নাকি আমির তার তুখোড় চতুরতা দিয়ে মন্ত্রী আর বিরোধী দল দুই পক্ষকেই দাবার ঘুঁটি বানিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নেবে?
চুরুটের আগুন নিভে আসছে। আমির সেদিকে তাকাল না।
সে ইতোমধ্যে পরের চাল ভাবতে শুরু করেছে।
↓
আমির গাড়ি থেকে নেমে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াল। রাত হয়ে গেছে। বাতাসে শিশিরের হালকা ছোঁয়া। আকাশে অসংখ্য তারা। কিন্তু এসবের দিকে মনোযোগ দেওয়ার ফুরসত নেই তার।
কবির, কুত্তার বাচ্চা কবির... ও আগে জানায়নি পদ্মজা দুপুরে তাকে খুঁজে অফিসে গিয়েছিল, আর এই না-জানানোটাই বুকের ভেতর শূলের মতো বিঁধছে। পদ্মজা কী মনে করে ফিরে গেছে কে জানে। ওর মুখে কি বিষণ্নতার ছায়া পড়েছিল? চোখ কি একটুও ভিজেছিল? নাকি সেই চিরচেনা নিরুদ্বেগ হাসিটা মুখে রেখেই ফিরে গেছে যে হাসি দেখলে আমিরের মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত সুখ বুঝি ওই একটা হাসির কাছে হার মেনে গেছে।
আমির দ্রুতপায়ে হাঁটতে লাগল। প্রতিদিন দেখা হয় পদ্মজার সঙ্গে। প্রতিটি সকাল, প্রতিটি সন্ধ্যা। তবু প্রতিদিন ফেরার সময় মনে হয় সে দীর্ঘ এক মরুপথ পাড়ি দিচ্ছে। বুকের ভেতর এমন সুখের স্রোত জেগে ওঠে যেন এটাই প্রথম দেখা, যেন এই মুহূর্তের আগে পৃথিবীটা কখনো এত রঙিন ছিল না। কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য!
এমন প্রলয়ঙ্কারী প্রেম কেন জন্মাল হৃদয়ে? কে বুনে দিয়ে গেছে এই আগুনের বীজ? এতো সুখ একটা মানুষের মধ্যে কী করে থাকতে পারে? ওতটুকু একটা শরীরে, ওতটুকু একটা হাসিতে? পদ্মজার কথা মনে পড়লে, তার কাছাকাছি যেতে চাইলে…শরীরের প্রতিটি কোণ পুড়ে যায় কীসের যেন এক দহনে। অথচ এই পোড়াতেও এত সুখ যে সে চায় না আগুন নিভুক, চায় না এই দহন থামুক। বরং আরও জ্বলুক, আরও পুড়ুক। এই আগুনের নামই তো পদ্মজা, আর পদ্মজাই তার সমস্ত পৃথিবী।
আমির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল চাপতেই ভেতর থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল। মুহূর্তের মধ্যেই কপাট খুলে গেল। পদ্মজা আগে থেকেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছিল। দরজা খুলতেই আমিরের চোখের সামনে ফুটে উঠল ‘পদ্মজা’ নামক ফুলটি। সৃষ্টিকর্তা যেন তার সমস্ত নিখুঁত কারুকার্য দিয়ে এই মেয়েটিকে গড়েছেন; যার সৌন্দর্যের কাছে সকল সৌন্দর্যও ম্লান হতে বাধ্য।
পদ্মজা মৃদুস্বরে সালাম দিল, ‘আসসালামু আলাইকুম।’’
‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম।’
বলতে বলতে আমির পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরল। আলতো করে চুমু খেল ওর কপালে। উনিশ-বিশ বছরের তরুণী পদ্মজার মাথাটা ঠিক আমিরের হৃদপিণ্ড বরাবর ঠেকে গেল।
পরক্ষণেই নিজেকে একটু ছাড়িয়ে নিয়ে অস্থির গলায় বলল, 'আপনার সাথে জরুরি কথা ছিল। অফিসেও গিয়েছিলাম, পাইনি। কোথায় ছিলেন?’
আমির পদ্মজার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল সোফার দিকে, নিজে বসল, পদ্মজাকেও নিজের কোলে বসিয়ে বলল, ‘এই অধমকে কেন খুঁজছিলেন রানী সাহেবা? বলুন, আপনার কথা শুনতে এই বান্দা সদা প্রস্তুত।’
‘হেয়ালি করবেন না। জরুরি কথা।’
আমির তৎক্ষণাৎ নিজের মুখভঙ্গি এমন করল যেন কোনো উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় মিটিংয়ে বসেছে। গম্ভীর হয়ে বলল, ‘জি ম্যাডাম, বলুন শুনি।’
‘নিলুফারের কথা মনে আছে আপনার?’
আমির একটু ভাবল। নিলুফার পদ্মজার কলেজের বন্ধু। যখন পদ্মজা তার তিন মাস বয়সী কন্যা পারিজাকে হারিয়ে ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছিল, তখন নিলুফার প্রায় প্রতিদিন আসত। চুপ করে পদ্মজার পাশে বসে থাকত। কথা বলত, হাসাত, কখনো কাঁদত। পদ্মজাকে শক্ত রাখার চেষ্টা করত। এমন বন্ধুকে কি ভোলা যায়?
‘মনে আছে। কেন, তার কি বিয়ে ঠিক হয়েছে?’
পদ্মজা মাথা নেড়ে বলল, ‘না! ওকে গত কয়েকদিন ধরে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। নানাবাড়ি গিয়েছিল, সেখান থেকে একদম উধাও হয়ে গেছে।’
‘কোনো প্রেমিকের হাত ধরে পালায়নি তো?’
পদ্মজা চোখ পাকাল। বলল, ‘আপনার যত আজেবাজে চিন্তা! ওর প্রেমিকই ওকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। ওদের তো খুব শীঘ্রই বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।’’
‘পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে?’’
‘দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পুলিশ কেমন যেন গা-ছাড়া ভাব দেখাচ্ছে। তেমন কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না। আপনার সাথে তো বড় বড় মন্ত্রী আর এমপিদের উঠাবসা। আপনি কি একটু তদবির করতে পারেন না? অন্তত পুলিশ যেন একটু সিরিয়াসলি তদন্ত করে।’ পদ্মজার চোখের কোণে জল টলমল করছে।
আমির স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কপাল কুঁচকে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সংশয়ের সুরে বলল, ‘এত বড় একটা মেয়ে, জনবহুল শহর থেকে হুট করে এভাবে গায়েব হয়ে গেল?’
‘কেউ কিডন্যাপ করলে? ধর্ষণ, খুন, গুম তো এখন প্রতিদিনের খবর হয়ে গেছে। আমি ভাবতেও পারছি না নিলুফারের সঙ্গে এমন কিছু…’ গলা আটকে গেল ওর।
‘আচ্ছা, আমি দেখছি। অস্থির হয়ো না।’
আমিরের কথায় পদ্মজার মনের ওপর চেপে বসা ভারী পাথরটা যেন কিছুটা হালকা হলো। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আমিরের শার্টের কলারটা ঠিক করে দিয়ে বলল, ‘এখন যান ফ্রেশ হয়ে আসুন। শরীর থেকে ঘামের গন্ধ বের হচ্ছে, এভাবে ঘাম নিয়ে বসে থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে।’
‘যাচ্ছি। খাবার রেডি করো না আবার। আব্বা আসছিলেন, উনার সাথেই বাইরে এক জায়গায় খেয়ে নিয়েছি। তবে তুমি যদি চাও, এই অধম আরেকবার পেটপূর্তি করতে রাজি আছে।’
পদ্মজা বিষ্ময়ে থেমে গেল। বলল, ‘আব্বা শহরে এলেন অথচ বাসায় এলেন না, কেন?’
‘আগামীকাল আসবেন। আজ উনার কোন এক পুরোনো বন্ধুর বাসায় গেছেন। অনেকদিন পর দেখা তো, তাই সেখানেই রয়ে গেলেন।’
‘ছেলের বাড়ি দোরগোড়ায় রেখে উনি বন্ধুর বাড়িতে রাত কাটাতে গেলেন? অদ্ভুত!’
‘উনার মর্জি! আসো তোমাকে খাইয়ে দিই।’
পদ্মজা আমিরের কোল থেকে সরে গিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। চলতে চলতেই বলল, ‘আজ রোজা ছিলাম, ইফতারি করে পেট ভরে গেছে। রাতে আর কিছু খাব না।’
আমির মনে করার চেষ্টা করল ক্যালেন্ডারের পাতাটা।
‘আজ কি সোমবার?’
পদ্মজা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল। সোমবার আর বৃহস্পতিবার প্রিয় নবী করীম (সা.) রোজা রাখতেন। পদ্মজা অতি নিষ্ঠার সাথে এই সুন্নত পালন করে আসছে এক বছর যাবৎ।
সে রান্নাঘরে ঢোকার আগে শাসনের সুরে বলল, ‘এসে যেন দেখি হাত-মুখ ধুয়ে বাবু হয়ে বসে আছেন।’
আমির সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল, ‘নিলুফার ঠিক কোথা থেকে নিখোঁজ হয়েছে?’
পদ্মজা ঘুরে দাঁড়াল। বলল, ‘নারায়ণগঞ্জ। ওর খালার বাসা থেকে।’’
শব্দটা কানে পড়তেই আমিরের পায়ের গতি একটু থমকে গেল! এত সামান্য যে পদ্মজা হয়তো খেয়াল করেনি। নারায়ণগঞ্জ! সপ্তাহখানেক আগেই তার ছেলেরা নারায়ণগঞ্জ থেকে দুটো মেয়েকে নিয়ে এসেছে! তাদের মধ্যে নিলুফার নেই তো?
↓
আমিরের জন্য রাখা খাবারগুলো গরম করে যত্ন করে গুছিয়ে রাখল পদ্মজা। মনার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখল, মনা ঘুমিয়ে পড়েছে। এই বাড়িতে কাজের মেয়ে হয়ে এসেছিল ও, কখন যে ঘরের মেয়ে হয়ে গেছে তা টেরই পায়নি। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে, যেভাবে কেবল আপনজনের ঘরেই ঘুমানো যায়। পদ্মজা হাত মুছতে মুছতে উপরে উঠে গেল।
আমির দরজার দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসে আছে, সামনে ছড়িয়ে আছে তার লিগ্যাল ব্যবসার কাগজপত্র। খুলনার পাইকগাছা আর সাতক্ষীরার ঘের থেকে আসা তাজা বাগদা আর গলদা চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত করে সে পাঠাত ইউরোপ আর আমেরিকার বাজারে, যেখানে এই চিংড়ির দাম আর চাহিদা দুটোই ছিল আকাশছোঁয়া মর্যাদায়। আমদানিতেও সে ছিল সমান দূরদর্শী। মানুষের ঘরে ঘুরো দুধের চাহিদা বাড়ছে দেখে ডেনমার্ক আর অস্ট্রেলিয়া থেকে আনত বড় বড় কন্টেইনার ভর্তি মিল্ক পাউডার, মালয়েশিয়া থেকে আসত পাম অয়েল, ব্রাজিল থেকে চিনি, আর ইলেকট্রনিক্সের প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ দেখে সিঙ্গাপুর আর জাপান থেকে আনত রঙিন টেলিভিশন, ক্যাসেট প্লেয়ার, আর ঘরোয়া বিলাসজাত নানা পণ্য। একদিকে এই বিস্তৃত সাম্রাজ্য, যেখানে পদ্মজা আসার পর থেকে সোনা ফলছে…অন্যদিকে অন্ধকারের জগৎ, যেখানে নারী পাচার আর অস্ত্র ব্যবসার শিকড় এতটাই গভীরে গেছে যে চাইলেই উপড়ে ফেলা যায় না। এতদিক সামলে আবার পদ্মজাকে সব অন্ধকার থেকে দূরে রাখার যে কঠিন যাত্রা…মাঝেমধ্যে ক্লান্ত লাগে। সব ছেড়ে পদ্মজাকে নিয়ে সন্ন্যাস নিতে ইচ্ছে করে। যেখানে শুধু তারা দুজন, শুধু আলো, শুধু শান্তি। কিন্তু তার তৈরি বিষবৃক্ষ সেটা কখনো হতে দেবে না৷ গিলে ফেলবে নিজের প্রভুকেই। সেও বোধহয় চায় না৷ তিলে তিলে গড়ে তোলা সাম্রাজ্য চাইলেই ছাড়া যায় না৷
‘পিঠে কী হয়েছে?’
পদ্মজার আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর শুনে আমির চমকে ঘুরে তাকাল। পদ্মজা ততক্ষণে দরজা থেকে ছিটকে সরে এসেছে তার দিকে।
আমিরের কাঁধের নিচে একটা টাটকা ক্ষত। মনে হচ্ছে, কেউ ধারালো কিছু দিয়ে আড়াআড়িভাবে কেটে দিয়েছে। পদ্মজার বুকটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরল। ভেতরটা কেমন অসাড় হয়ে আসছে।
‘কথা বলছেন না কেন? কী করে হয়েছে এটা?’
‘শান্ত হও। বড় কিছু না।’
‘বড় কিছু না মানে? এটাকে বড় না বললে বড় কোনটাকে বলবেন? আপনি মানুষ? এত বড় ক্ষত নিয়েও স্বাভাবিক ছিলেন, টুঁ শব্দটিও করলেন না!’
‘ওষুধ লাগিয়েছিলাম। ঠিক হয়ে যাবে।’
‘কী ওষুধ লাগিয়েছেন যে দেখাই যাচ্ছে না? রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে।’
পদ্মজা আর কথা বাড়াল না। কথায় সময় নষ্ট করার মেয়ে সে নয়। একটা ছোট কৌটা আর পরিষ্কার সুতি কাপড় বের করে আনল। তখনকার দিনে ঘরোয়া দাওয়াইয়ের চল ছিল ঘরে ঘরে। রাসায়নিকের চেয়ে প্রকৃতির দাওয়াইয়ে বিশ্বাস ছিল মানুষের বেশি। একটা ছোট পিরিচে সে তৈরি করল কাঁচা হলুদের রস আর খাঁটি নিম তেলের মিশ্রণ। তারপর আলতো হাতে শুকনো রক্ত পরিষ্কার করতে করতে বলল, ‘কার সঙ্গে মারামারি করেছেন?’
‘মারামারি করেছি কেন মনে হচ্ছে?’
‘এমনি মনে হচ্ছে।’
আমির একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘রিদওয়ান এসেছিল।’
এটুকুই যথেষ্ট। পদ্মজা যা বোঝার বুঝে গেছে। এই দুজন সামনা-সামনি হলে যা হওয়ার কথা, তা-ই হয়েছে, যা সবসময় হয়। সে কথা না বাড়িয়ে হলুদের প্রলেপটা আলতো করে লাগাতে শুরু করল পিঠে। আমির একটু কেঁপে উঠল, পশম খাড়া হয়ে গেল গায়ের।
পদ্মজার চোখ টলমল করে উঠল। বলল, ‘খুব জ্বলছে?’
আমির হাসল। কী করে সে বোঝাবে, ক্ষতের জ্বলুনিটা পদ্মজার শীতল হাতের স্পর্শে উল্টো মিলিয়ে যাচ্ছে!
বারান্দা থেকে বাতাস আসছে৷ শীতের শেষ বাতাস, পর্দাগুলো উড়ছে অলসভাবে।
পদ্মজা প্রলেপ লাগাতে লাগাতে বলল, ‘ওই লোককে এড়িয়ে চলতে পারেন না?’
‘পারলে কি আর লাগতাম? আমি কি যেচে মারামারি করার মানুষ?’
আমিরের পিঠের পেছনে পদ্মজা, তবুও সে টের পাচ্ছে পদ্মজা কাঁদছে। আর শুধুমাত্র এই কারণেই আমির আর নিজে মারপিটে নামে না। লোক পাঠায়, নিজেকে আড়ালে রাখে, যতটা সম্ভব নিরাপদ থাকার চেষ্টা করে। এই শরীর তার নিজের নয়, এই শরীর পদ্মজার। শুধুই পদ্মজার। তাইতো সে ব্যথা পেলে পদ্মজা কাঁদে!
পদ্মজা হঠাৎ ঝুঁকে আমিরের ক্ষতস্থানে একটা আলতো চুমু এঁকে দিল। সেই স্পর্শ পাওয়ামাত্র আমিরের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমশীতল, মিষ্টি স্রোত নেমে গেল। লাজুক পদ্মজাও জেনে গেছে প্রেমিকের ক্ষতের ঔষধ কোনো হাকিম বা বৈদ্যের কাছে পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় প্রেমিকার ঠোঁটে!
আমির হাসল। গলা নামিয়ে বলল, ‘ভালো লেগেছে।’
লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল পদ্মজার মুখ। সে উঠতে যাবে, আমির পেছন না ফিরেই বলল, ‘আরেকবার দেবে?’
তারপর ঘুরে তাকাল।
11 hours ago | [YT] | 48
View 2 replies
TAHA
আমির হাওলাদার: এক ছদ্মবেশীর উপাখ্যান
#১_প্রথম_পার্ট
‘আমির ভাই, এই মালটা দেখেন। type 56 ।’
আমির ভ্রু কুঁচকে রাইফেলটা হাতে নিল। ওটার ওজন আর ফিনিশিং দেখে অবিকল AK-47 মনে হচ্ছে। সে চেম্বার চ্যাক করল, তারপর ট্রিগার টেনে শুধু ক্লিক শব্দটা শুনল। বলল, ‘মালটা তো দেখছি পুরাই AK-47 ’
কেরামত হাতের তালু কচলাতে কচলাতে বলল, ‘আরে না ভাই, এই জন্যই তো আপনের কাছে আসলাম। এইটা ভাই চীনারা বানাইছে, হুবহু সোভিয়েত AK-47 এর মতন। দেখতে কন আর পারফরম্যান্স কন, একদম এক। কিন্তু কারিশমা হইলো অন্য জায়গায়। দামে এইটা অরিজিনাল মালের থেইকা অনেক সস্তা।’
আমির রাইফেলের ব্যারেলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কোয়ালিটি ড্রপ করবে না তো? ফায়ারের সময় হাত থেকে উড়ে গেলে তো খবর আছে।’
‘আরে না ভাই, চীনারা এইখানে কোনো ছাড় দেয় নাই। জ্যাম হওয়ার ভয় নাই। এই মাল যদি একবার চীন থেইকা সরাসরি কন্টেইনারে ভইরা আনাইতে পারি আর দেশের বাজারে ছাড়তে পারি…ভাই রে, পুরা বাজার গরম হইয়া যাইবো। লাখ লাখ না, কোটি টাকা আয় হবে। সামনে নির্বাচনের সময় ক্যাডাররা এই সস্তা আর কড়া মালের জন্য পাগল হইয়া যাইবো।’
আমির রাইফেলটা টেবিলের ওপর রেখে বলল, ‘কাস্টমস আর কোস্টগার্ড একটু কড়া হয়েছে।’
‘সেই জন্যই তো ভাই আপনের কাছে আসা। এই চালান দেশে ঢুকানোর ক্ষমতা আপনের ছাড়া আর কারো নাই। আপনে শুধু একবার হাত দেন আমির ভাই, আমাগো ভাগ্য খুইলা যাবে। এক শিপমেন্ট মাল যেমনে পারেন আনানোর ব্যবস্থা করেন।’
আমির চুরুট ধরাল। বলল, ‘টাকা আর রুটের চিন্তা আমি করতেছি। তুই চীনার সঙ্গে ডিল কনফার্ম কর।’
কেরামত মাথা নেড়ে সায় দিতে যাবে, ঠিক তখনই কোনো আগাম সংকেত ছাড়াই দড়াম করে খুলে গেল আমিরের অফিস কামরার ভারী সেগুন কাঠের দরজাটা। প্রটোকলের তোয়াক্কা না করে ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকে পড়লেন এমপি বজলুল হক।
সাধারণত এমপি আসার আগে তার পিএস ফোন দেয়, বাইরে গানম্যানরা পজিশন নেয়, আজ সেসবের বালাই নেই।
এমপির অনাহূত উপস্থিতিতে ঘরের ভেতরের শান্ত পরিবেশটা এক নিমেষে থমথমে হয়ে গেল। আমির ইশারা করলে কেরামত টেবিল থেকে তার ফাইলটা তুলে মাথা নিচু করে দ্রুতপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় দরজার পাল্লাটা নিঃশব্দে টেনে দিয়ে গেল।
বজলুল হক চেয়ারে বসেই বললেন, ‘আমির সাহেব, বাড়াবাড়ি কইরা ফেলাইতেছেন! কমিশনার সাবের কানে অলরেডি খবর গেছে, আপনি মানুষ চালান করতেছেন। ফিশিং ট্রলারে মাছের বদলে মেয়ে মানুষ পাচারের এই মরণখ্যাল আমি আর সইতে পারুম না। পার্টি থেইকা চাপ আছে। আপনার জন্য আমার চেয়ার নিয়া টানাটানি শুরু হইছে। পার্সেন্টেজ আর প্রোটেকশন মানি দুইটাই ডবল করতে হইবো।’’
আমির শান্তভাবে অ্যাশট্রেতে চুরুটটা ঘষে নিভিয়ে দিয়ে বলল, ‘চেয়ারের চিন্তা ছাড়েন হক সাহেব। চেয়ারটা কার টাকায় কেনা, সেটা ভুলে যাইয়েন না।’
‘আপনিও ভুলে যাইয়েন না, আমরা সরকার। আমার একটা সিগন্যালে আপনার ফ্যাক্টরি আর গোডাউন এক রাতে মাটির সাথে মিশায়া দিতে পারি। বড় বেশি উঁচুতে উইঠা গেছেন আপনি।’
আমির বজলুল হকের দিকে একটা খাম এগিয়ে দিল। যেখানে কিছু গোপন ছবি রাখা। ক্রুর হাসি হেসে বলল, ‘উঁচুতে তো আমি এমনি উঠিনি হক সাহেব, আপনাদের কাঁধে পাড়া দিয়েই উঠছি। এই যে ছবিগুলা দেখতেছেন, গত মাসে আপনার ছেলেপেলেরা আমার চালানের পাহারা দিছে, সেইখানে আপনার নিজের ছোট ভাইও ছিল। আমি ডুবলে কিন্তু একা ডুবব না, পুরো দল নিয়ে তলাব।’
ছবিগুলো দেখে বজলুল হকের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বলল, ‘আপনি আমারে ব্ল্যাকমেইল করতেছেন? এই সাহস কই পান? আমরা না থাকলে আপনার এই নারী পাচারের সিন্ডিকেট এক সপ্তাহও টিকবে না।’
আমির শব্দ করে হেসে উঠল এইবার। যেন কৌতুক শুনল মাত্র। বলল, ‘টিকবে না? হক সাহেব, আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন, এই যে মফস্বলের ছেলেপেলেদের নিয়া এসে ঢাকা শহরে মিছিল করান, তাদের হাতে চায়না পিস্তলটা কে তুলে দেয়? আপনাদের নির্বাচনী ফান্ডে কয়েক কোটি কালো টাকা কে সাদা করে দেয়? আমি ছাড়া উপায় আছে আপনাদের? আমি না থাকলে আজ আপনি সংসদে না, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকতেন। আপনারা হলেন আমার পালিত হায়েনা। আমি মাংস ছুঁড়ে দেই বলেই আপনারা কামড়া-কামড়ি করে আমার সাম্রাজ্য পাহারা দেন। আমারে কামড়াতে আসিয়েন না হজম করতে পারবেন না।'
‘আপনি কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করতেছেন। আমরা সরকার চালাই, আমরা পলিসি মেকার। আমরা এদেশের রাজা।’
আমির চেয়ার ছেড়ে উঠে বজলুল হকের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। চোখে চোখ রেখে বলল, 'আপনারা মনে করেন আপনারা দেশ চালান? ভুল! আপনারা হলেন আমার দাবার বোর্ডের একেকটা বোড়ে। আমি আপনাদের হাতে একটা খেলনা (অস্ত্র) ধরিয়ে দেই, আর আপনারা খুশিতে ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে নিজেদের লোকের রক্ত ঝরান। আমার চোখে একেকটা দল মানে কী জানেন? একেকটা বলদের গোয়াল! আমি সামনে ঘাস ছড়িয়ে দেই, আর আপনারা সেই ঘাসের লোভে আমার কন্টেইনার পার করার রাস্তা পরিষ্কার করে দেন। কারে গরম দেখান আপনি?’
বজলুল হক রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন, ‘আপনি কি বলতে চান আমরা আপনার গোলাম?’
'গোলাম না বলে পার্টনার বলেন, শুনতে ভালো লাগবে। আপনাদের রাজনীতি চলে আমার কালো টাকায়, আমার অস্ত্রে... আর আমার ব্যবসা চলে আপনাদের স্ট্যাম্পে। কিন্তু মাথায় উঠতে চাইলে এটা মনে রাইখেন, স্ট্যাম্প মারার জন্য হাত থাকলেই চলে...এখন সেটা আপনি মারেন বা অন্য কেউ! হাত হলেই হলো। যে অস্ত্র আমি আপনাদের দিছি, সেইটার নল আপনার দিকে ঘুরাতে আমার ছেলেদের এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না। রমজানের আগে দয়া করে নিজের মাথা গরম করবেন না। আমারটাও করবেন না। ইফতারের দাওয়াতটা পকেটে নিয়া শান্তিমতো চল যান।'
‘এর ফল কিন্তু ভালো হবে না আমির। তুমি অনেক কথা বইলা ফেলছো।’
বজলুল পূর্ব পরিচয়ের সম্বোধনে চলে গেলেন।
‘ফল তো আমি প্রতিদিন ভোগ করি। এই যে চিংড়ির এক্সপোর্ট দেখতেছেন, এর ভেতরে কতজনের কলিজা পাচার হয়ে গেছে তার খবর আপনার ডিজি সাহেবও জানে না। যান, গিয়া নিজের দল সামলান। কালকের মধ্যে আপনার একাউন্টে ফান্ডের টাকা পৌছে যাবে। এখন আসুন।’
আলমগীর জানালার পর্দা সরিয়ে দেখল, এমপি বজলুল হকের গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে আমিরকে সংশয় নিয়ে বলল, ‘লোকটা এম্পি, তার হাতে সরকারি ক্ষমতা। সে যদি সত্যি সত্যি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আমাদের বিপক্ষে দাঁড়ায়? উনি এক ফোনে তোর ফ্যাক্টরি সিল করে দিতে পারে!’
‘তাহলে উনি নিজেও ডুববে। আমাদের কাছে কি কম অস্ত্র আছে? এই দেশে যোগ্য ব্যক্তির চেয়ে অযোগ্য ব্যক্তিরাই বেশি আসনে বসে। অযোগ্য লোকেদের এটাই সুবিধা, একটু ভয় দেখাইলে এরা কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে।’
‘আমার চিন্তা হচ্ছে। উনি সংসদে বসে! তুই একজন এম্পিকে 'বলদ' বললি? যদি ও ওপর মহলে আমাদের ব্যবসার লিস্টটা ধরিয়ে দেয়?’
‘বজলুল হক এম্পি হয়েছে আমার টাকায়। ওরে এম্পি আমি বানিয়েছি৷ দুই বছরেই শুয়ো** বাচ্চা, নিজের অতীত ভুলে গেছে৷ ও যদি আমাকে ডুবাতে চায়, তবে রশিতে টান দেওয়ার আগেই ওর নিজের গদি ফাঁস হয়ে ওর গলায় ঝুলবে। ও’রে আমার খুব ভালো করে চেনা আছে।’
আলমগীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আমির বলল, ‘বজলুল হককে নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা কোরো না। ও এখন বাড়িতে গিয়ে শান্ত মাথায় নিজের লাভ-ক্ষতির খতিয়ান মেলাবে। আমিরের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার পরিণাম যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেটা বোঝার মতো রাজনৈতিক জ্ঞান ওর আছে। বজলুল অন্য দশটা সাধারণ এমপির মতো না। ওর টিকে থাকাটাই নির্ভর করে আমার দাক্ষিণ্যের ওপর। ও ভালো করেই জানে, ও আমার মাকড়সার জালে আটকে গেছে।’
‘সে তো তুইও আটকে আছিস আমির। তোর সঙ্গে আমরাও একটা বৈশ্বিক মাকড়সার জালে আটকা পড়েছি। জালটা দিন দিন বড় হচ্ছে, জটিল হচ্ছে।’
আমির কিছু বলল না। ধীর পায়ে জানালার কাছে এগিয়ে গেল। বাইরে তখন বিকেল হচ্ছে। দূরে কোথাও একটা গাড়ির হর্ন একবার ডেকে থেমে গেল।
নারী পাচার আর অস্ত্রের আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট এখন তার হাতের মুঠোয়। মধ্যপ্রাচ্যের মসনদে বসে থাকা প্রভাবশালী মন্ত্রী, রাজপুত্র, তেলের টাকায় ফোলা অহংকারী আমিরদের বিকৃত শখের যোগানদাতা সে। দিনের আলোয় যারা ধর্মের ঝান্ডা বহন করে মিছিলে হাঁটেন, রাতের অন্ধকারে তাদের সেই মুখোশের আড়ালের পচা মুখগুলো আমির চেনে হাতের তালুর মতো। তাদের এমন সব ব্যক্তিগত পাপের দলিল, কলঙ্কিত নথিপত্র আমিরের জিম্মায় আছে, যেগুলো একবার জনসমক্ষে এলে ওরা তাসের ঘরের মতো ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
তারাও জানে আমিরের জীবনের দুর্বল শিরাটির কথা। পদ্মজা। তার স্ত্রী। ভুবনমোহিনী এক রূপসি, যার পায়ের নখ থেকে চুলের ডগা পর্যন্ত কোথাও কোনো কলঙ্কের ছায়া নেই।
জানালার কাঁচে সে নিজের প্রতিবিম্ব দেখল। তীক্ষ্ণ চোয়াল, শান্ত চোখ, ঠোঁটের কোণে চুরুটের ধোঁয়া।
এক অদৃশ্য আন্তর্জাতিক লবিস্ট চক্র পাহাড়ের মতো তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। এই ভূ-রাজনৈতিক দাবার খেলায় আমির এমন এক 'স্মুথ অপারেটর', যার একটি ইশারায় বিদেশের গডফাদাররা এদেশের মসনদ এক রাতের মধ্যে উল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তারা আমিরকে পাহারা দেয় নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে। তার মতো নিখুঁত যোগানদাতা এই অঞ্চলে আর দ্বিতীয়টি নেই বলে।
একদিকে দুবাই-কুয়েতের হারেমে নারী পাচারের অন্ধকার বাজারে সে কুড়িয়েছে প্রশ্নাতীত বিশ্বস্ততা। অন্যদিকে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের চালান এনে এদেশের ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদদের মাথায় পরিয়ে দিচ্ছে দম্ভের মুকুট। আমির জানে তার মূল্য কতখানি! তার পতন মানে অনেক বড় বড় প্রাসাদের ভিত নড়ে ওঠা।
আলমগীর খুব নিচু গলায় বলল, ‘তোর যদি কোনোদিন ইচ্ছে হয় এখান থেকে বেরোনোর?’
আমির ঘুরে দাঁড়িয়ে চুরুটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল, ‘এই খেলায় প্রবেশপথ আছে বড় ভাই, প্রস্থানপথ নেই। এখান থেকে বের হতে চাওয়া মানেই নিজের মৃত্যুপরোয়ানা সই করা। তবে যতদিন এই ময়দানে আছি, রাজার মতোই খেলব।’
আলমগীর প্রসঙ্গ পালটে বলল, ‘মন্ত্রী সাহেব আগামীকাল তোকে তার বাড়িতে ডেকেছেন।’’
আমির ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘সালাহউদ্দিন তারিক?’’
‘হুম। উনার গলার স্বর মোটেও সুবিধাজনক ছিলনা।’
আমির স্থির হয়ে দাঁড়াল।
চার চালানের বকেয়া পাওনা শোধ না করায় সে চুক্তি ভেঙে বিরোধী দলকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে, এই সংবাদ নিশ্চয়ই মন্ত্রীর কানে পৌঁছে গেছে। বিশ্বাসঘাতকতার গন্ধ দ্রুত ছড়ায়! কানে আসন্ন ঝড়ের গর্জন শোনা যাচ্ছে।
সালাহউদ্দিন তারিক রাষ্ট্রযন্ত্রের দাঁতনখ নিয়ে বহু পুরনো শত্রুকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সে কি এবার তাকে পিষে ফেলবে? তার ছদ্মবেশ ভেঙে, তার কাচের গম্বুজে ঢিল ছুড়ে পদ্মজার নিষ্পাপ পৃথিবীটাকে খান খান করে দেবে?
11 hours ago (edited) | [YT] | 42
View 5 replies
TAHA
তোমরা চাইলে রিক্তা ইসলাম মায়া'আপুর লেখা উপন্যাস গুলা আমি একটা একটা করে দিতে পারি কারণ সব গুলা একসাথে দেওয়া সম্ভব না যে গুলার পর্ব দেওয়া শেষ ওই গুলাই দিবো,, রানিং গুলো না কারণ তোমরা নিজে'রাই বিরক্ত হয়ে যাও অপেক্ষা করতে করতে আর আমার একটা টেনশন থাকে যে কবে পর্বগুলা পাবো আর তোমাদেরকে দিব,, তার থেকে ভালো যে গুলার পর্ব দেওয়া শেষ আমি ভাবতেছি ওই গুলা দিবো কি বলো তোমরা..?
13 hours ago | [YT] | 57
View 21 replies
Load more