বিষ্যুদবারের গপ্পো #ThrowbackThursday মুখে দিলে গলে যায়, আহারে কী মিষ্টি!
মাছের রাজা যদি ইলিশ হয়, আর ফলের রাজা আম, মিষ্টির রাজা তাহলে কে? সঠিক উত্তরের জন্য কোনও পুরস্কার নেই। কারণ, প্রশ্নটা সহজ, আর উত্তরও তো জানা! রসগোল্লা! সেই রসগোল্লার ইতিহাসের কিছু জানা-অজানা কাহিনি নিয়েই আজ 'বিষ্যুদবারের গপ্পোর' প্রথম পর্ব। সিরিজের শুরুটা মিষ্টিমুখ দিয়েই হোক!
রসগোল্লার জন্মপঞ্জি নিয়ে কিছু মতভেদ আছে। ইতিহাসের কিছু নথি অনুযায়ী, ১৮৬০ সালে নদিয়ার ফুলিয়ায় হারাধন রায় প্রথম রসগোল্লা তৈরি করেছিলেন। ভিন্নমতে, রসগোল্লার জন্ম ১৮৬০ সালে, কলকাতার ব্রজ ময়রার হাত ধরে। তবে যে আধুনিক স্পঞ্জ রসগোল্লার স্বাদে আট থেকে আশির বাঙালি গত দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে মোহিত, ছানা আর চিনির রসের মিশেলে তৈরি গোলাকার যে মিষ্টির খ্যাতি রাজ্য বা দেশের সীমা পেরিয়ে বিস্তৃত সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে, তার স্রষ্টার নাম নিয়ে কোনও সংশয় নেই। দ্বিমত নেই সৃষ্টির ঠিকুজিকোষ্ঠী নিয়েও। ১৮৬৮ সালে বাগবাজারের নবীন চন্দ্র দাশই প্রথম তৈরি করেন স্পঞ্জ রসগোল্লা। 'রসগোল্লার কলম্বাস' আখ্যা যদি কাউকে দিতে হয়, তিনি নবীন ময়রাই।
নবীন ময়রার কাহিনি অবশ্য 'এলাম, দেখলাম, জয় করলাম'-এর নয়। জন্ম ১৮৪৫ সালে। নবীনের বাবা ছিলেন মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী। মারা গিয়েছিলেন নবীনের জন্মের কয়েক মাস আগে। পরিবার পড়েছিল অকূল পাথারে, চরম দারিদ্রে কেটেছিল নবীনের ছেলেবেলা। তাঁকেই পরিবারের হাল ধরতে হবে যেনতেনপ্রকারেণ, এই সারসত্য আঠারো পেরনোর আগেই দিব্যি বুঝে গিয়েছিলেন নবীন। মাথায় অষ্টপ্রহর ঘুরত অন্যরকম মিষ্টি বানানোর স্বপ্ন। এমন মিষ্টি, যা বঙ্গদেশে কেন, ভূভারতেই কেউ কখনও খায়নি।
কীরকম মিষ্টি? এক পরিচিত কিশোরী আবদার জানিয়েছিল যুবক নবীনের কাছে,
'চটচটে নয়, শুকনো হতে মানা,
দেখতে হবে ধবধবে চাঁদপানা
এমন মিষ্টি ভূভারতে নাই,
নবীন ময়রা, এমন মিষ্টি চাই।'
কিশোরীর পরিচয়? প্রবাদপ্রতিম ভোলা ময়রার কন্যা ক্ষিরোদমণি। যিনি কয়েক বছর পরে ঘরণী হয়েছিলেন নবীন চন্দ্রের।
কিন্তু 'এমন মিষ্টি চাই' বললেই তো আর হয় না। মিষ্টি নিয়ে নানান পরীক্ষানিরীক্ষায় নবীন চন্দ্র কাটিয়েছিলেন বহু বিনিদ্র রাত। ছানা আর চিনির রস দিয়ে অভিনব একটা জিনিস বানাতে চাইছেন। কিন্তু মনের মতো আর হচ্ছে না কিছুতেই। ছানা কাটানো ঠিকঠাক হচ্ছে, তো চিনির রসটা লাগসই গরম হচ্ছে না। রসে চিনির ভাগ মাপমতো হচ্ছে, তো মিষ্টিতে নরম ভাবটা আসছে না। হাল ছাড়েননি নবীন ময়রা, ১৮৬৮ সালে শেষমেশ তৈরি করে ফেললেন ঠিক যেমনটা চেয়েছিলেন, তেমন মিষ্টি। তুলতুলে স্পঞ্জের মতো নরম এবং দুধসাদা ছানার বল। রসগোল্লা! মুখে দিলে গলে যায়, আহারে কী মিষ্টি!
বাংলার মিষ্টির দুনিয়ায় সেই যে শুরু হল রসগোল্লা-রাজ, আজ দেড়শো বছর পেরিয়েও তার রাজ্যপাটে বিন্দুমাত্র আঁচড় তো পড়েইনি, বরং দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সারা পৃথিবীতেই ক্রমে রসগোল্লা হয়ে উঠেছে বাংলার অন্যতম আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। নবীন চন্দ্রের সুযোগ্য পুত্র কৃষ্ণচন্দ্র দাশের উদ্যোগে টিনবন্দি রসগোল্লা অনায়াসে পাড়ি দিয়েছে বিশ্বপরিক্রমায়।
কয়েক বছর আগে হঠাৎই তর্ক দানা বেধেছিল রসগোল্লার উৎপত্তিগত মালিকানা নিয়ে। কথা নেই বার্তা নেই, উড়িষ্যা ভাগ বসাতে চেয়েছিল বাংলার রসগোল্লা-আধিপত্যে। দাবি করা হয়েছিল, রসগোল্লার আঁতুড়ঘর আসলে বাংলায় নয়, উড়িষ্যায়! 'রসগোল্লা তুমি কার?', এই প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল রাতারাতি। সব তর্ক, সব চাপানউতোরে অবশ্য পাকাপাকি দাঁড়ি পড়ে গিয়েছিল ২০১৭-র ১৪ নভেম্বর, যে দিন কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে রসগোল্লার 'জি আই' (জিওগ্রাফিকাল ইন্ডিকেশন) অথবা 'ভৌগলিক নির্দেশক' ট্যাগ দেওয়া হয়েছিল বাংলাকেই। মিষ্টিকুলশ্রেষ্ঠ রসগোল্লার জন্ম যে বাংলাতেই, সেই সহজ সত্যিটায় পড়েছিল স্বীকৃতির সিলমোহর। ২০১৮ থেকেই ১৪ নভেম্বর মানে বাংলায় রসগোল্লা দিবস!
ও হ্যাঁ, একটা খুচরো তথ্য বাকি থেকে গিয়েছে। রবীন্দ্র সরণিতে নবীনচন্দ্র দাশের যে আদি বাসভবন, তার নামকরণ নিয়ে পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মকে তিলমাত্রও ভাবতে হয়নি। রসগোল্লার স্রষ্টার বাড়ির নাম আর কী-ই বা হতে পারে, 'রসগোল্লা ভবন' ছাড়া?
West Bengal Police Official
বিষ্যুদবারের গপ্পো #ThrowbackThursday
মুখে দিলে গলে যায়, আহারে কী মিষ্টি!
মাছের রাজা যদি ইলিশ হয়, আর ফলের রাজা আম, মিষ্টির রাজা তাহলে কে? সঠিক উত্তরের জন্য কোনও পুরস্কার নেই। কারণ, প্রশ্নটা সহজ, আর উত্তরও তো জানা! রসগোল্লা! সেই রসগোল্লার ইতিহাসের কিছু জানা-অজানা কাহিনি নিয়েই আজ 'বিষ্যুদবারের গপ্পোর' প্রথম পর্ব। সিরিজের শুরুটা মিষ্টিমুখ দিয়েই হোক!
রসগোল্লার জন্মপঞ্জি নিয়ে কিছু মতভেদ আছে। ইতিহাসের কিছু নথি অনুযায়ী, ১৮৬০ সালে নদিয়ার ফুলিয়ায় হারাধন রায় প্রথম রসগোল্লা তৈরি করেছিলেন। ভিন্নমতে, রসগোল্লার জন্ম ১৮৬০ সালে, কলকাতার ব্রজ ময়রার হাত ধরে। তবে যে আধুনিক স্পঞ্জ রসগোল্লার স্বাদে আট থেকে আশির বাঙালি গত দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে মোহিত, ছানা আর চিনির রসের মিশেলে তৈরি গোলাকার যে মিষ্টির খ্যাতি রাজ্য বা দেশের সীমা পেরিয়ে বিস্তৃত সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে, তার স্রষ্টার নাম নিয়ে কোনও সংশয় নেই। দ্বিমত নেই সৃষ্টির ঠিকুজিকোষ্ঠী নিয়েও। ১৮৬৮ সালে বাগবাজারের নবীন চন্দ্র দাশই প্রথম তৈরি করেন স্পঞ্জ রসগোল্লা। 'রসগোল্লার কলম্বাস' আখ্যা যদি কাউকে দিতে হয়, তিনি নবীন ময়রাই।
নবীন ময়রার কাহিনি অবশ্য 'এলাম, দেখলাম, জয় করলাম'-এর নয়। জন্ম ১৮৪৫ সালে। নবীনের বাবা ছিলেন মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী। মারা গিয়েছিলেন নবীনের জন্মের কয়েক মাস আগে। পরিবার পড়েছিল অকূল পাথারে, চরম দারিদ্রে কেটেছিল নবীনের ছেলেবেলা। তাঁকেই পরিবারের হাল ধরতে হবে যেনতেনপ্রকারেণ, এই সারসত্য আঠারো পেরনোর আগেই দিব্যি বুঝে গিয়েছিলেন নবীন। মাথায় অষ্টপ্রহর ঘুরত অন্যরকম মিষ্টি বানানোর স্বপ্ন। এমন মিষ্টি, যা বঙ্গদেশে কেন, ভূভারতেই কেউ কখনও খায়নি।
কীরকম মিষ্টি? এক পরিচিত কিশোরী আবদার জানিয়েছিল যুবক নবীনের কাছে,
'চটচটে নয়, শুকনো হতে মানা,
দেখতে হবে ধবধবে চাঁদপানা
এমন মিষ্টি ভূভারতে নাই,
নবীন ময়রা, এমন মিষ্টি চাই।'
কিশোরীর পরিচয়? প্রবাদপ্রতিম ভোলা ময়রার কন্যা ক্ষিরোদমণি। যিনি কয়েক বছর পরে ঘরণী হয়েছিলেন নবীন চন্দ্রের।
কিন্তু 'এমন মিষ্টি চাই' বললেই তো আর হয় না। মিষ্টি নিয়ে নানান পরীক্ষানিরীক্ষায় নবীন চন্দ্র কাটিয়েছিলেন বহু বিনিদ্র রাত। ছানা আর চিনির রস দিয়ে অভিনব একটা জিনিস বানাতে চাইছেন। কিন্তু মনের মতো আর হচ্ছে না কিছুতেই। ছানা কাটানো ঠিকঠাক হচ্ছে, তো চিনির রসটা লাগসই গরম হচ্ছে না। রসে চিনির ভাগ মাপমতো হচ্ছে, তো মিষ্টিতে নরম ভাবটা আসছে না। হাল ছাড়েননি নবীন ময়রা, ১৮৬৮ সালে শেষমেশ তৈরি করে ফেললেন ঠিক যেমনটা চেয়েছিলেন, তেমন মিষ্টি। তুলতুলে স্পঞ্জের মতো নরম এবং দুধসাদা ছানার বল। রসগোল্লা! মুখে দিলে গলে যায়, আহারে কী মিষ্টি!
বাংলার মিষ্টির দুনিয়ায় সেই যে শুরু হল রসগোল্লা-রাজ, আজ দেড়শো বছর পেরিয়েও তার রাজ্যপাটে বিন্দুমাত্র আঁচড় তো পড়েইনি, বরং দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সারা পৃথিবীতেই ক্রমে রসগোল্লা হয়ে উঠেছে বাংলার অন্যতম আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। নবীন চন্দ্রের সুযোগ্য পুত্র কৃষ্ণচন্দ্র দাশের উদ্যোগে টিনবন্দি রসগোল্লা অনায়াসে পাড়ি দিয়েছে বিশ্বপরিক্রমায়।
কয়েক বছর আগে হঠাৎই তর্ক দানা বেধেছিল রসগোল্লার উৎপত্তিগত মালিকানা নিয়ে। কথা নেই বার্তা নেই, উড়িষ্যা ভাগ বসাতে চেয়েছিল বাংলার রসগোল্লা-আধিপত্যে। দাবি করা হয়েছিল, রসগোল্লার আঁতুড়ঘর আসলে বাংলায় নয়, উড়িষ্যায়! 'রসগোল্লা তুমি কার?', এই প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল রাতারাতি। সব তর্ক, সব চাপানউতোরে অবশ্য পাকাপাকি দাঁড়ি পড়ে গিয়েছিল ২০১৭-র ১৪ নভেম্বর, যে দিন কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে রসগোল্লার 'জি আই' (জিওগ্রাফিকাল ইন্ডিকেশন) অথবা 'ভৌগলিক নির্দেশক' ট্যাগ দেওয়া হয়েছিল বাংলাকেই। মিষ্টিকুলশ্রেষ্ঠ রসগোল্লার জন্ম যে বাংলাতেই, সেই সহজ সত্যিটায় পড়েছিল স্বীকৃতির সিলমোহর। ২০১৮ থেকেই ১৪ নভেম্বর মানে বাংলায় রসগোল্লা দিবস!
ও হ্যাঁ, একটা খুচরো তথ্য বাকি থেকে গিয়েছে। রবীন্দ্র সরণিতে নবীনচন্দ্র দাশের যে আদি বাসভবন, তার নামকরণ নিয়ে পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মকে তিলমাত্রও ভাবতে হয়নি। রসগোল্লার স্রষ্টার বাড়ির নাম আর কী-ই বা হতে পারে, 'রসগোল্লা ভবন' ছাড়া?
2 years ago | [YT] | 9
View 1 reply